সুভাাসিনী তার বিড়াল ছানাটাকে কোলে নিয়ে বিশাল বড় এক আয়নার সামনে দাড়িয়ে আছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আয়নার অপর পাশের দুনিয়া দেখতে চলে যাবে। আয়নার অপর পাশের দুনিয়া দেখার জন্য সায়েন্স প্রজেক্ট হিসেবে বানানো মেশিন চালু হয়ে গেছে।
ফ্ল্যাসব্যাক :
সুভাসিনীর প্রিয় প্রাণী হচ্ছে বিড়াল। রাজীব তা জানে। কিন্তু কেন সুহাসিনীর বিড়াল ভালো লাগে তা রাজীব জানে না।
সেটা জানার জন্য রাজীব আবারো সুভাসিনীকে জিজ্ঞেস করল, "সুভা, তোর সবচেয়ে বেশী ভালো লাগে কোন প্রাণী?"
রাজীব সুভাসিনীকে সুভা বলে ডাকে ।
সুভাসিনী উত্তরে বলল, "তোকে কতবার বলবো আমার সবচেয়ে বেশী বিড়াল ভালো লাগে। তুই এক প্রশ্নের উত্তর যে কয় হাজার বার জানতে চাস তা সৃষ্টিকর্তা ভালো জানেন।"
রাজীব বলল, "কেন বিড়াল ভালো লাগে তোর কাছে? এই প্রশ্নটা যদি কখনও জিজ্ঞেস না করে থাকি তাহলে এটার উত্তর জানতে চাই।"
সুভাসিনী প্রতিউত্তর দিলো, "না কখনও এইটা জিজ্ঞেস করিসনি। বিড়াল অনেক কিউট হয়। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা আমি একটা বিড়ালছানা পুষবো। রাজীব আগামীকাল আমার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তুই অবশ্যই আসবি। ঠিক আছে?"
"নারে। কাল আমার সায়েন্স প্রজেক্ট বানানোর লাস্ট ডেট। এখনো অনেক কাজ বাকি। তাই আসতে মনে হয় পারবো না।"
"ধুরর। তোর সাইন্স প্রজেক্টের গুষ্টি কিলাই। ভেবেছিলাম, কাল তুই বাসায় এলে তোকে বাবা মায়ের সাথে দেখা করাবো। আর তুই কি সব আলতু ফালতু প্রজেক্ট ফজেক্টের জন্য আমার জন্মদিনের পার্টি মিস করবি তা হবে না।"
"আমার প্রজেক্টকে আলতু ফালতু বলার সাহস তোকে কে দিয়েছে। এই প্রজেক্টটা কম্পিলিট হলে আমি ফেমাস হয়ে যাবো। অনেক অজানা রহস্যের সমাধান ঘটবে।"
"এতো কিছু জানি না। তুই আগামীকাল আমাদের বাসায় আসবি। না আসলে তোর সাথে কাট্টি।"এই বলে সুভাসিনী রাগ করে চলে যেতে লাগল। রাজীব পেছন থেকে সুভাসিনীর ডান হাতটা টেনে ধরে এক ঝটকায় তাকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে ফেলল। দুজনে একে অপরের দিকে মন্ত্রমুগদ্ধের মত তাকিয়ে রইলো। চক্ষুযুগল একে অপরের কাছে তাদের মনের ভাষা প্রকাশ করতে লাগল।
এভাবেই কিছু সময় কেটে যেতেই হঠাৎ রাজীবের ফোনের রিংটনটা বেজে উঠলো। ফোনের আওয়াজে তাদের ঘোর কাটলো। রাজীব পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করল। ফোনে সায়েন্স প্রজেক্ট সম্পর্কে কথা বলতে বলতে সুভাসিনীকে রেখেই রাজীব চলে গেলো। সুভাসিনী সেখানে দাড়িয়ে থেকে রাজীবের চলে যাওয়া চোখ ছলছল দৃষ্টিতে দেখতে থাকলো।
আজ সুভাসিনীর জন্মদিন। অনেকেই তাকে নানানভাবে উইস করে যাচ্ছে। কিন্তু রাজীব এখনো তাকে উইস করেনি।
এদিকে রাজীব তার প্রজেক্ট নিয়ে ল্যাবে কাজ করছে। সে এতো ব্যস্ত যে তার দম ফেলারো সময় নেই। সব কাজ বিকালের আগে শেষ করতে হবে। কারণ সন্ধ্যায় সুভাসিনীর জন্মদিনের অনুষ্ঠান।
হঠাৎ করে রাজীবের ফোনটা বেজে উঠলো । রাজীব কে ফোন দিয়েছে সেটা না দেখেই ফোনকলটা কেটে দিয়ে মোবাইল সুইচ অফ করে দিলো।
ফোনের অপরপ্রান্তে সুভাসিনী শুনতে পেলো অপারেটরের থেকে বলছে দ্যা নাম্বার ইউ ডায়াল ইজ কারেন্টলি সুইচড ওফ।
সুভাসিনীর মন খুব খারাপ হয়ে গেলো । সে রুমের দরজা লাগিয়ে বসে রইলো। এদিকে সন্ধ্যার সময় জন্মদিনের অনুষ্ঠান শুরু বলেই বিকাল থেকেই সব মেহমানরা বাসায় আসতে লাগলো। কিন্তু সেদিকে সুভাসিনীর কোনো খেয়াল নেই। সে তখনও মন খারাপ করে বসে আছে।
তার বাবা ও মা দুজনেই এসে রুমের দরজায় কড়া নেড়ে তাকে তাড়াতাড়ি রেডী হয়ে অনুষ্ঠানে আসতে বলল। কিন্তু সুভাসিনীর কোন ভাবান্তর হলো না।
হঠাৎ কোথা থেকে যেনো বিড়ালের মিউ মিউ ডাক শোনা গেলো। সুভাসিনী সেই আওয়াজ কোন জায়গার থেকে আসছে তা খোঁজ করতে লাগলো। বন্ধ দরজার অপর পাশ থেকে বিড়ালের মিউ ডাক ভেসে আসছে। সে রুমের দরজা খুলে দেখলো দরজার সামনে একটা সুন্দর ঝুড়িতে ছোট এক বিড়াল ছানা বসে আছে। সেই মিউ মিউ করে ডাকছে। ঝুড়ি থেকে বিড়াল ছানাটাকে কোলে নিয়ে এবং ঝুড়িটা হাতে নিয়ে আবার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।
বিড়ালটাকে নিয়ে বিছানার উপর বসে ঝুড়ির ভেতর আর কিছু আছে কিনা তা দেখতে লাগলো। দেখলো অনেকগুলো কিটক্যাটের প্যাকেট সেই সাথে একটা চিঠি।
চিঠিতে লেখা :
শুভ জন্মদিন সুভা।
জানি আমার উপর অনেক রাগ করে আছিস। তোকে এতো দেরী করে উইস করেছি , তার উপর আবার তোর ফোন ধরিনি। রাগ করিস না প্লিজ।
তাড়াতাড়ি রেডী হয়েনে। সবাই তোর জন্য ওয়েট করছে।গিফটটা কেমন হয়েছে জানাবি কিন্তু।
ইতি,
রাজীব।
চিঠি পড়েই সুভাসিনীর মন ভালো হয়ে গেলো। যাক রাজীব তাহলে এসেছে। সুভাসিনী খুশিমনে কালো রঙের শাড়ী পরলো, একগুচ্ছ রংবেরঙের চুড়ি পরলো, চোখে গাঢ় করে কাজল দিলো।এরকম হালকা সাজেই সে পার্টিতে গেল। তাকে দেখে সবাই অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলো। যার জন্মদিন সে এতো হালকা সাজ দিয়েছে, অথচ তাকেই সবার চেয়ে বেশী সুন্দর লাগছে। এতো মানুষ তাকে মুগ্ধ নয়নে দেখছে কিন্তু তার নয়ন এদের ভীড়ে রাজীবকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
সুভাসিনীর বাবা তাকে হাত ধরে কেকের কাছে নিয়ে গেলো। তারপর বলল, "মা চল কেকটা কাটি।" বাবার হাত ধরে সুভাসিনী কেক কাটলো। সবাই হ্যাপি বার্থডে বলে হাতে তালি দিলো। কেক কাটার পর সুভাসিনী তার বাবা এবং মাকে নিজ হাতে কেক খাইয়ে দিলো। বাবা এবং মা দুজনে ও তাকে কেক খাইয়ে দিলো।
এরপর শুরু হলো খাওয়াদাওয়ার পর্ব। খাওয়াদাওয়া শেষ হলে সুভাসিনীর কাজিন এবং কিছু ফ্রেন্ডরা মিলে গান, নাচ ও লেট নাইট পার্টি করার আয়োজন করেছে।
সুভাসিনী এক কোনে দাড়িয়ে তার মা বাবা মেহমানদের কীভাবে আপ্যায়ন করছে তা দেখছিলো। হঠাৎই পিছন থেকে কে যেন তার হাত ধরে টান মারলো । পিছে ঘুরে দেখলো রাজীব দাঁড়িয়ে আছে। সুভাসিনী উচ্ছাসিত গলায় বলল, "রাজীব তুই কোথায় ছিলি এতোক্ষণ ?"
"সুভা ছাদে চল আমার সাথে।"এই বলে রাজীব তার হাত ধরে তাকে ছাদে নিয়ে গেলো।
ছাদে গিয়ে সুভাসিনী সারপ্রাইজড হয়ে গেলো। ছাদের চিলেকোঠার ঘরটা খুব সুন্দর করে বেলুন আর মোমবাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। একটা টি টেবিলের উপর একটা কেক রাখা।
রাজীব বলল, "হ্যাপি বার্থ ডে সুভা। তোর জন্মদিন উপলক্ষে তোকে একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ দিলাম। চল কেক কাটি।"
দুজনে মিলে কেকটা কেটে একে অপরকে খাইয়ে দিলো।
সুভাসিনী কেকের একটা টুকরা নিয়ে রাজীবের গালে মাখিয়ে দিলো। কেকের একটা টুকরা নিয়ে যখনই রাজীব সুভাসিনীর গালে মাখাতে যাবে তখনই সে দৌড়ে চিলেকোঠা থেকে ছাদে চলে গেলো। রাজীব ও পিছুপিছু ছুটে এসে সুভাসিনীকে ধরে ফেলে গালে কেক মাখিয়ে দিলো। এই প্রথমবারের মতো রাজীবের হাতের ছোঁয়ায় সুভাসিনী শিহরিত হলো, তার সারা শরীর কেঁপে উঠলো।অবস্থা বুঝতে পেরে রাজীব তাকে ছেড়ে দিলো। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ রইলো। নীরবতা ভেঙ্গে রাজীব বলল, "তোকে আমার কিছু বলার ছিল।"
এই কথাটা শুনে সুভাসিনী ভাবলো রাজীব হয়তবা সুভাসিনীকে তার মনের কথাটা বলে দিবে। গতকাল রাজীবের চোখে তার প্রতি রাজীবের ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে। আর যাই হোক মানুষের চোখ কখনও মিথ্যা বলেনা।
সুভাসিনীও রাজীবকে ভালোবাসে। কিন্তু বলেনি। কারণ রাজীব তাকে ভালোবাসে কিনা সেটা নিয়ে তার সন্দেহ ছিল। যদি নিজের থেকে প্রপোজ করার পর তাদের বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে যায় সেই ভয়ে সে রাজীবকে প্রপোজ করেনি। কিন্তু গতকাল রাজীবের চোখের ভাষা তার সন্দেহ দূর করে দিয়েছে।
সুভাসিনী উচ্ছাসিত কন্ঠে বলল, "কি বলবি বল?"
"আমার তোর সাপোর্টের খুব দরকার। তুই সাপোর্ট করবিতো?"
"আগে বলবিতো কিসে কোন ব্যাপারে সাপোর্ট করবো?"
"তুইতো জানিস আমি সায়েন্স প্রজেক্ট হিসেবে একটা মেশিন বানিয়েছি।"
"হ্যাঁ, জানি।"
"ঐ মেশিনটা দিয়ে আয়নার ভেতরে যাওয়া সম্ভব। আয়নার অপর পাশের দুনিয়ায় কি আছে তা দেখার জন্যই মেশিনটা বানিয়েছি।"
মেশিনটা বানানো শেষ এখন শুধু পরীক্ষা করে দেখা বাকি মেশিনের কার্যকারিতা কতটুকু।
"পরীক্ষা করে দেখবি। এর জন্য আবার সাপোর্ট চাওয়ার কি আছে?"
"আছে। মেশিনে করে আমি একা আয়নার অপর প্রান্তের দুনিয়া দেখতে যেতে চাই।"
কিন্তু মা ও বাবা সেটা চান না। তারা চান অন্য কাউকে দিয়ে এই পরীক্ষাটা করানো হোক। আমি একা তো দূরের কথা কারো সাথেও যেনো না যাই।
কথাটা শুনে সুভাসিনীর মন মুহূর্তেই খারাপ হয়ে গেল। তার কেন যেন ভয় লাগছে। তাই সে নিজেও চাচ্ছে না যে রাজীব একা আয়নার অপর পাশের দুনিয়া দেখতে যাক।
"কিরে, কিছু বলছিস না যে? আমার ভালো বন্ধু হিসেবে তোর মতামত কি? আমাকে কি যাওয়ার জন্য সাপোর্ট করবি? নাকি মা বাবার মতো তুই ও না করবি?"
"তোর যখন যেতে ইচ্ছা তখন যাবি। আমি না করবো কেন?"
"তুই একমাত্র আমাকে বুঝিস আমি কি চাই। তোকে অনেক ধন্যবাদ আমার পক্ষে থাকার জন্য।"
"তা কবে যাচ্ছিস সেখানে?"
"আজ রাতেই তোর এখান থেকে সোজা ল্যাবে যাবো। সেখান থেকে মেশিন চালু করে আয়নার সামনে দাড়ালেই হলো।"
এই মুহূর্তে সুভাসিনীর অনেক কান্না পাচ্ছে। চোখের পানিগুলোকে কষ্ট করে আটকিয়ে রেখেছে সে। যে কোন সময় চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরবে এমন অবস্থা। রাজীব যেনো তার কান্না দেখতে না পারে তাই সে মাথা নিচু করে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
"তুই না বলেছিলি তোর বাবা মায়ের সাথে আমাকে দেখা করাবি। চল দেখা করে আসি।"
সুভাসিনী তার চোখের কোনা আলতো করে মুছে রাজীবের দিকে ফিরে বলল,"চল নিচে যাই।"
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতেই রাজীবের ফোন বেজে উঠলো। রাজীব ফোন রিসিভ করলো। রাজীবের চেহারা দেখে মনে হলো যে অনেক গুরুত্বপূর্ন ব্যাপারে অপর প্রান্ত থেকে বলা হচ্ছে। রাজীব 'জী, আচ্ছা' বলে ফোন কেটে দিলো।
"আমাকে এক্ষুণি যেতে হবে রে। হাতে খুব বেশী সময় নেই। ভালো থাকিস।"এই বলে রাজীব ঝড়ের গতিতে সুভাসিনীদের বাসা থেকে বের হয়ে গেলো। সুভাসিনী তার চলে যাওয়া কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে দেখলো। তারপর নিজের রুমে গিয়ে দরজা আটকিয়ে কান্না করা শুরু।
কান্না করতে করতেই এক সময় সে ঘুমিয়ে গেলো। পরেরদিন সকালে ফোনের আওয়াজে তার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ফোনটা রিসিভ করতে ওপাশ থেকে রাসভারী কন্ঠে কেউ একজন বলল, "মিস সুভা, আপনি তাড়াতাড়ি সিটি হসপিটাল চলে আসুন।"
সুভাসিনী কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে গেলো। হঠাৎ মনে হলো সুভা বলে একমাত্র রাজীবই তাকে ডাকে। আর রাজীবের ফোনে তার নাম্বারটা এই নামেই সেভ করা। তার মানে রাজীবের কিছু হয়নিতো। সুভাসিনী তাড়াহুড়ো করে তখনই বাসা থেকে বের হয়ে গেলো। একটা সিএনজি ভাড়া নিয়ে হসপিটালের দিকে ছুটলো।
হসপিটালে ঢুকে রিসিপশনে বসা মেয়েটির কাছে গিয়ে সুভাসিনী বলল,"ঘন্টাখানেক আগে আমাকে এখানে আসার জন্য ফোন করা হয়েছিল।"
"আপনি কি সুভা?"
"জি।"
"আসুন আমার সাথে।"এই বলে রিসিপশনে বসা মেয়েটি তাকে একটি কেবিনের সামনে নিয়ে গেলো। কেবিনের দরজার বাইরে থেকে সুভাসিনী দেখলো রাজীব অক্সিজেন মাস্ক লাগানো অবস্থায় বেডে শুয়ে আছে। মাথায় ব্যান্ডেজ লাগানো।
"ভেতরে যান। কিন্তু বেশীক্ষণ থাকবেন না। এই বলে মেয়েটি চলে গেলো।"
ভেতরে গিয়ে সে রাজীবের পাশে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে রইলো। রাজীবের জ্ঞান ফিরছে বলে মনে হয় কারন তার নিথর হাতের আঙ্গুল গুলো হঠাৎই নড়ে উঠলো। কিছুক্ষণ পরেই রাজীব চোখ পিটপিট করে তাকালো। সুভাসিনী বলল, "তুই থাক, আমি ডাক্তারকে ডেকে আনি।"
এক পা এগুতেই রাজীব সুভাসিনীর হাতটা আলতো করে টেনে ধরলো। সে দাড়িয়ে পরলে ইশারায় তাকে অক্সিজেন মাস্কটা খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিলো।
সুভাসিনী মাস্কটা খুলে দিতেই রাজীব ফিসফিস করে বলল,"আমার মনে হয় বেশীক্ষণ এ জগতে থাকা হবেনা। আমার কিছু হয়ে গেলে তুই আয়নার অপর পাশের জগতে বিড়ালটাকে সাথে নিয়ে যাবি।"
"তোর কিছু হবে না। তুই খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবি।"
রাজীব অনেক কষ্টে টেনে টেনে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, "তোর সাথে আয়নার অপর পাশের দুনিয়ায় আবার দেখা হবে।"
সুভাসিনী তাড়াতাড়ি অক্সিজেন মাক্সটা লাগিয়ে দিলো। তারপর ডাক্তারকে ডেকে আনার জন্য রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
রুম থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যেতেই রাজীবের মা বাবার সাথে তার দেখা হলো। রাজীবের মা হেচকি তুলে কাঁদছেন আর রাজীবের বাবা তাকে সান্তনা দিচ্ছে। সুভাসিনীকে দেখা মাত্রই কান্নাজড়িত কন্ঠে তার মা বললেন, "আমার ছেলের এই রকম অবস্থা কীভাবে হলো !"
সুভাসিনী নিজেও জানে না রাজীবের এই অবস্থা কিভাবে হলো? রাজীব হসপিটালে কিভাবে এসেছে?
রাজীবের বাবা বলল, "আমার ছেলেটাকে হসপিটালে নিয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ।"
সুভাসিনীর মনে খটকা লাগলো। সে রাজীবকে হসপিটালে নিয়ে আসেনি। সে নিজেই ফোন পেয়ে হসপিটালে এসেছে। কোথাও কোনো না কোনো গন্ডগলতো আছেই। সুভাসিনী রাজীবের মা বাবাকে কিছুই বলল না। এই রহস্যের সমাধান সে নিজে করবে। সে রিসিপশনের দিকে গেলো। যেই মেয়েটা তাকে ফোন দিয়েছিলো সেই মেয়েটাকে খুঁজতে গিয়ে দেখলো মেয়েটি নেই। সেখানে একজন লোক বসে আছে।
সুভাসিনী তাকে বলল, "কেবিন নম্বর- ৫০৪ এ যে পেশেন্ট আছে, উনাকে হসপিটালে কারা এডমিট করেছে বলতে পারবেন?"
"সরি, ম্যাডাম। কে বা কারা এডমিট করেছে সেই তথ্য আমাদের কাছে নেই।"
"পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে।"
"ম্যাডাম আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আমরা ডাক্তার পাঠাচ্ছি।"
এই বলে লোকটা টেলিফোন নিয়ে ফোন করতে লাগলো।
কিছুক্ষন পরেই একজন ডাক্তার রাজীবের রুমের দিকে ছুটে গেলো। সুভাসিনী দূর থেকে তা দেখলো। এই মুহূর্তে তার মাথায় একটা চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে রাজীবের এই অবস্থা কিভাবে হলো? আর কে বা কারা তাকে হাসপাতালে ফেলে রেখে চলে গেছে?
আধঘন্টা পর ডাক্তার রুম থেকে বের হতেই রাজীবের বাবা মা তার কাছে তাদের ছেলের অবস্থা জানার জন্য ছুটে গেলো। ডাক্তার রাজীবের বাবার পিঠ চাপড়ে সান্তনা দিয়ে, 'হি ইজ নো মর' বলে চলে গেলেন। রাজীবের মা কথাটা শুনা মাত্রই ডুকরে কেদে উঠলো। রাজীবের বাবা তাকে সামলানোর চেষ্টা করতে লাগলেন।
ডাক্তারের মুখে রাজীবের মৃত্যুর কথা শুনে সুভাসিনী অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পরে গেলো। একদিন পর সুভাসিনীর জ্ঞান ফিরলো। জ্ঞান ফিরে সে নিজেকে হসপিটালের বেডে স্যালাইন লাগানো অবস্থায় আবিষ্কার করলো। সে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠতে নিলে নার্স তাকে বাধা দিলো। সুভাসিনী চিৎকার করতে লাগলো, 'আমি রাজীবের কাছে যাবো, আমাকে যেতে দাও' । তার চিৎকার শুনে আরেকজন নার্স ইনজেকশন নিয়ে এসে তার স্যালাইন লাগানো হাতে পুশ করলো। সাথে সাথে সুভাসিনী অতল গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।
রাজীবের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর সুভাসিনী হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলো। তার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না রাজীব আর নেই।
সুভাসিনী জানে রাজীব ডায়েরী লিখতো। সারাদিন কি কি ঘটলো তার সব কিছুরই বর্ননা ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করতো সে। এই ডায়েরীটাই এখন রাজীব সম্পর্কিত সকল রহস্য উদ্ধারের একমাত্র চাবিকাঠি।
বাসায় ফেরার পরেরদিন বিকালের দিকে সুভাসিনী রাজীবদের বাসায় গেলো। সেখানে গিয়ে প্রথমে রাজীবের মা বাবার সাথে কিছুক্ষণ সান্ত্বনামূলক কথা বলল। কথাবার্তার ফাঁকেই রাজীবের রুম থেকে ডায়েরী এবং ল্যাবের চাবিটা খুঁজে বের করে ব্যাগে ভরে নিলো সে।তারপর তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে এলো।
রাতের বেলা খাওয়াদাওয়া শেষে রাজীবের ডায়েরীটা হাতে নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো সুভাসিনী। ডায়েরীটা খুলে সে পড়তে শুরু করলো।
রাজীবের ডায়েরীটা পড়ার পর সুভাসিনীর মন আরো বেশী খারাপ হয়ে গেলো। তার ইচ্ছা করলো চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে কান্না করতে। কিন্তু তা সে পারলো না বরং নীরবে চোখ দিয়ে ঝড়ে পরলো দু ফোটা অশ্রু বিন্দু।
পুরোটা ডায়েরী জুড়েই শুধুই যে সুভাসিনী সম্পর্কেই লিখা। রাজীব ও তাকে ভালোবাসতো। কিন্তু কখনও বলার সাহস পায়নি, যদি বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে যায় সেই ভয়ে।রাজীবের মৃত্যুটা দূর্ঘটনা বলে মনে হলেও এই দূর্ঘটনার পিছনে কোনো একটা রহস্য অবশ্যই আছে।
সুভাসিনীর মনে হলো রাজীবের তৈরী করা মেশিনটার জন্যই সম্ভবত কেউ শত্রুতা করে তার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিলো। যদি এটাই সঠিক হয় তাহলে যে এই কাজ করেছে সে তার চেষ্টায় সফল। ডায়েরীতে মেশিনটা সম্পর্কে অনেক কিছুই লিখা আছে। এই প্রজেক্টটাতে রাজীব একা ছিলো না। তার সাথে পার্টনার হিসেবে তার বন্ধু রাতুল ছিলো। সুভাসিনী রাতুলকে এর আগেও এক দুইবার রাজীবের সাথে দেখেছে। সুভাসিনী ভাবছে, রাতুল কি পুরো প্রজেক্টটা নিজের নামে নেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র করে রাজীবকে মারার প্ল্যান করে নিতো ! সন্দেহের তীরটা রাতুলের দিকেই গেলো। পরের দিন সকালে সুভা ডায়েরীতে লিখে রাখা রাতুলের নাম্বারে ফোন দিলো। রিং হওয়ার সাথে সাথেই অপর পাশ থেকে ফোনকল রিসিভ করে বলল, "হ্যালো, কে বলছেন?"
"হ্যালো, মি. রাতুল আছে?"
"জি আমিই রাতুল। আপনি কে?"
"আমি কে সেটা না হয় পরেই জানবেন। আজ বিকালে চারটার দিকে আপনাদের ল্যাবের সামনে থাকবেন। আপনার সাথে সামনাসামনি দেখা করে কথা বলা দরকার। তখনই না হয় আমার পরিচয়টা পাবেন।
এই বলে রাতুল কিছু বলার আগেই সুভাসিনী ফোনটা খট করে কেটে দেয়।
দুপুরবেলা সুভাসিনী প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলো। তারপর একটা কাগজে তার মা বাবার উদ্দেশ্যে লিখলো,
আম্মু ও আব্বু,
"তোমরা জানো যে, রাজীব আমার ভালো বন্ধু ছিলো। বন্ধু বললে ভুল হবে বন্ধুর চেয়েও বেশী... কারন আমি রাজীবকে ভালোবাসতাম। এই কথাটা এতো দিন তোমাদেরকে জানাইনি। এমনকি রাজীব ও জানতে পারেনি। আমার ভালোবাসার মানুষটা আমার ভাগ্যে নেই। কিন্তু ভালোবাসার মানুষের জীবনের শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করার দায়িত্ব আমার কাঁধে। এরকম সৌভাগ্য কয় জনেরই বা হয়। তাইতো আমি রাজীবের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে যাচ্ছি। কবে নাগাদ ফিরে আসি। বা আদৌ ফিরে আসবো কিনা জানিনা। তোমাদের মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করো।"
চিঠিটা পড়ার টেবিলের উপর এমনভাবে রেখে দিলো যাতে মা বাবার চোখে পড়ে। তারপর বিড়ালটাকে সাথে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো।
বিকালের দিকে সুভাসিনী রাজীবের ল্যাবে গিয়ে পৌছালো। তারপর রাতুলের নাম্বারে কল দিলো। কল দেওয়ার সাথে সাথে আশেপাশে কোথাও রিংটনের আওয়াজ হলো। সেই আওয়াজ অনুসরন করে সে যে দিক থেকে ভেসে আসছে সেদিকে গেলো। দেখলো একদম ল্যাবের ভিতরে গেটের সামনে রাতুল দাঁড়িয়ে আছে। রাতুল সুভাসিনীকে দেখে চমকে উঠে বলল, "আরে, তুমি এখানে?"
"কেন? অন্য কারো কি আসার কথা ছিলো। আমিই তো ফোনে বললাম বিকালে চারটার দিকে ল্যাবে আসবো।"
"ও তুমি ফোন দিয়েছিলে। আমি তো ভেবেছিলাম কে না কে যেনো আমার সাথে ফান করছে হয়তো। তো কি ব্যাপারে এসেছো?"
"তোমাদের প্রজেক্টের বানানো মেশিনটা দেখতে এসেছি। মেশিনটা কি পরীক্ষা করে দেখেছো কাজ হয় কি না?"
"না। পরীক্ষা রাজীবের করার কথা ছিলো। রাজীব তো নেই তাই পরীক্ষা করা হয়নি। রাজীব যে এতো তাড়াতাড়ি এভাবে পরপারে চলে যাবে ভাবতেই পারিনি।"
"যে রাতে রাজীব এক্সিডেন্ট করে সে রাতেইতো মেশিন কাজ করে কিনা সেটা যাচাই করার কথা ছিলো?"
" হ্যাঁ। কিন্তু রাজীব সে রাতে ল্যাবে ফেরেনি। আমি তার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম।"
"তুমি রাজীবকে ফোন দেওনি?"
"ফোন দিয়েছিলাম। একবার ফোন ধরে বলেছিলো আসছি। পরে ওর দেরী দেখে আবারও ফোন দিয়েছিলাম। কিন্তু তখন আর সে ফোন ধরেনি। পরেরদিন সকালে খবর পাই রাজীব হাসপাতালে।"
"ও আচ্ছা। আসলে আমি এখানে এসেছি রাজীবের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে। রাজীবের শেষ ইচ্ছা কি ছিলো জানো?"
সুভাসিনীর মুখে 'রাজীবের শেষ ইচ্ছা পূরন করতে এসেছি।' এই কথা শুনে রাতুলের শরীর হালকা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো । আমতা আমতা করে রাতুল জিজ্ঞেস করলো, "কি ইচ্ছা?"
রাতুলের শরীরের কাঁপুনি সুভাসিনীর দৃষ্টির অগোচরে গেলো না। তার সন্দেহ আরো প্রবল হলো। তাইতো সে একটা ঠান্ডা হাসি দিয়ে বলল, "তোমাকে মেরে ফেলা।"
রাতুল সুভাসিনীর কথা শুনে ভীতস্বরে বলল, "কি বললে তুমি! আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছে?"
সুভাসিনী অট্টহাসি দিয়ে বলল, "আরে, তুমি দেখছি ভয় পেয়ে গেছো। আমিতো ফান করছিলাম। রাজীবের পরিবর্তে আমি যেনো আয়নার অপর পাশের দুনিয়া ভ্রমনে যাই। সেটাই ছিলো তার শেষ ইচ্ছা। আজ আমি রাজীবের ইচ্ছা পূরণের জন্যই এখানে এসেছি।"
রাজীব এই কথা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,"তুমি কি আজই রাজীবের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে চাও?"
"আমি সব প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি।"
"ঠিক আছে। আসো আমার সাথে।"
এই বলে রাতুল ল্যাবের ভেতরে মেশিন যে রুমে রাখা সেই রুমের দিকে গেলো। সুভাসিনীও বিড়ালটাকে নিয়ে রাতুলের পিছু পিছু গেলো। রুমটা বেশ অন্ধকার। তাই রুমের মধ্যে ঢুকেই রাতুল লাইট জ্বেলে দিলো। এরপর মেশিনের কাছে গিয়ে সব কিছু চেক করে দেখলো ঠিকঠাক আছে কি না। বড় আয়নাটার দিকে মেশিনের প্রবেশমুখ তাক করে দিলো। তারপর সুভাসিনীকে মেশিনের প্রবেশমুখ দিয়ে ভেতরে গিয়ে আয়নার দিকে মুখ করে দাঁড়াতে বলল।
সুভাসিনী মেশিনের ভেতরে ঢুকার আগে তার হাতে থাকা পার্টস ব্যাগটা রাতুলকে দিয়ে বলল, "এটা আমার মা বাবার কাছে পৌছে দিও। তারা সবকিছু জানেন না। তাই তাদের সব ঘটনা বিস্তারিত বুঝিয়ে বলে দিও।" রাতুল ব্যাগটা হাতে নিলো।
সুভাসিনী বিড়াল ছানাটাকে কোলে নিয়ে আয়নার দিকে মুখ করে দাঁড়ালো। মেশিনের ভেতর থেকে বাইরের সব কিছু পরিষ্কার দেখা যায়।
রাতুল সুভাসিনীকে বলল, "তুমি রেডিতো?"
সুভাসিনী মাথা নাড়লো।
তাই দেখে রাতুল বাইরে মেশিনের গায়ে থাকা কয়েকটা বোতাম টিপলো। তার কিছুক্ষন পরেই আয়নার অপর পাশে যাওয়ার জন্য তৈরী মেশিন চালু হয়ে গেলো। সেই সাথে বিকট একটা শব্দ হয়ে আয়নার মাঝখানে ফেটে চৌচির হলো। মেশিনটা সেই ফাটল দিয়ে আয়নার ভেতর নিমিশেই ঢুকে গেলো।
ল্যাবের ভেতর থেকে মেশিনটা সুভাসিনীকে নিয়ে আয়নার ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর রাতুল বেশ খুশি হলো। তাদের এতোদিনের পরিশ্রম সফল হয়েছে। অবশ্য মেশিনটা তৈরীর সময় তার থেকে বেশী পরিশ্রম রাজীব করেছে। বেচারা রাজীব গাধার মতো খেটে গেলেও তার স্বীকৃতি, সাফল্যের ভাগ পুরাটাই এখন রাতুল পাবে। এটা ভেবেই সে হা হা করে অট্টহাসি হাসতে লাগলো। তার এতো দিনের মনের সাধ অবশেষে পূরণ হয়েছে। ল্যাব থেকে বের হয়ে রাতুল মনের সুখে সিগারেট ধরালো। সিগারেট টানতে টানতে সে সুভাসিনীদের বাসায় যাওয়ার জন্য একটা ট্যাক্সি নিলো।
সুভাসিনীদের বাসায় পৌছে সে কলিংবেলে একবার টিপ দিতে না দিতেই দরজা খুলে গেলো। দরজা খুলেছে সুভাসিনীর বাবা। রাতুল তাকে জিজ্ঞেস করলো, "এটা কি সুভাসিনীদের বাসা?"
"জ্বি। কি দরকার?"
"আমি সুভাসিনীর বন্ধু রাতুল।"
"আসো। ভিতরে আসো।"
"না আংকেল। আমি সুভাসিনীর পার্টসটা দিতে এসেছি। ও এইটা আমার বাসায় ভুলে ফেলে রেখে গেছে।"
"ও কখন তোমার বাসায় গিয়েছিলো ?"
"এইতো, বিকালের দিকে কিছু সময়ের জন্য এসেছিলো। তারপর তড়িঘড়ি বেড়িয়ে গেলো।"
"তোমাকে কি কিছু বলেছিলো?"
"না আংকেল। তেমন কোনো বিষয়ে আমাদের কথা হয়নি। কেন কি হয়েছে?"
"সুভাসিনী এখনো বাড়িতে ফিরেনি।"
"কি বলছেন আংকেল ! এটা তো বড় চিন্তার বিষয়। আপনারা পুলিশে খবর দিয়েছেন?"
"না এখনো দেইনি। কিন্তু টেনশন হচ্ছে।"
"টেনশন করবেন না। সুভাসিনী তাড়াতাড়ি চলে আসবে। আর ও ফিরলে আমাকে খবর দিতে বলবেন। আসি আংকেল।" এই বলে রাতুল চলে গেলো।"
রাতুল মিথ্যা বলল সুভাসিনীর বাবাকে। সুভাসিনী বলেছিলো সব বুঝিয়ে বলতে। কিন্তু রাতুল তা করেনি ? কিন্তু কেনো? নিশ্চয় রাতুলের মনে কোনো না কোনো প্যাঁচতো আছেই।
সুভাসিনীর মা বাবার হাতে যখন চিঠিটা পরলো তখন সুভাসিনী মেশিনের ভেতরে দাঁড়ানো। চিঠিতে সুভাসিনী রাজীবের শেষ ইচ্ছাটা কি সেটা লেখেনি। সেটা জানার জন্য তারা সুভাসিনীর ফোনে কল দিতে লাগলো। চব্বিশ ঘন্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর সুভাসিনীর মা বাবা যখন দেখলো তার কোনো খবর নেই, তখন তারা প্রথমে রাজীবের বাসায় তার মা বাবার সাথে যোগাযোগ করলো। রাজীবের মা বাবা তাদের ছেলের মৃত্যুশোক এখনো ভুলতে পারেনি। তারা সুভাসিনীর হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার পিছনে কিছুই জানে না। তাদের ছেলের জন্য একটা মেয়ে হঠাৎ করে বাসা থেকে উধাও হয়ে গেছে এটা জানতে পেরে তারা আরোও বিমর্ষ হয়ে পড়ল। সুভাসিনীর মা বাবা আত্নীয় স্বজন, প্রতিবেশী, সুভাসিনীর বন্ধু বান্ধব সবার সাথে যোগাযোগ করে দেখলো মেয়ের খোঁজ পাওয়া যায় কিনা। যখন কোথাও কোনো খবর পেলো না তখন নিরুপায় হয়ে পুলিশের কাছে গেলো সাহায্য চাইতে। পুলিশ তাদেরকে আশা দিলো সুভাসিনীকে খুঁজে দিবে। কিন্তু এরপর প্রায় তিনদিন পেরিয়ে গেলো অথচ পুলিশ তাকে খুঁজে বের করার জন্য ঠিকমত তদন্ত ও করল না।
আয়না বা আরশি এমন একটা জিনিস যার ভেতর আমরা নিজেদের অবয়ব স্পষ্টভাবে দেখি। আয়নার ভেতর আমাদের চেহারা যেমন দেখা যায়, ঠিক তেমনি আরশির অপর প্রান্তের দুনিয়াতে আমাদের মত একই রকম চেহারার মানুষ বাস করে তবে চেহারা এক হলেও স্বভাব বিপরীত। তবে আরশির ভেতরে জায়গা বদলের শক্তি নেই।
তাইতো মেশিনটা সুভাসিনীকে নিয়ে পৃথিবীতে ঠিক যে জায়গায় রাজীবদের ল্যাবটার অবস্থান সেখানে এসে থামলো। কিন্তু এখানে ল্যাবটা নেই। সেখানে আছে একটা জঙ্গল। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, বড় বড় গাছগাছালিতে ভরা। বিড়ালটাকে নিয়ে মেশিনটার ভেতর থেকে বের হয়ে এলো সুভা। তারপর মেশিনটা সেখানেই ফেলে রেখেই হাঁটা শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে সুভাসিনী যখন লোকালয়ে বড় রাস্তার কাছাকাছি এসে পড়লো তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। এতোবেলা হাঁটাতে তার শরীরে বেশ ক্লান্তি অনুভূত হচ্ছে। সেই সাথে তার খুব ক্ষুধাও পেয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্তি এবং ক্ষুধায় একসময় সুভাসিনী বিড়ালটাকে নিয়ে রাস্তার উপর ধপাস করে বসে পড়ল। রাস্তা দিয়ে মাঝে মধ্যেই লোকজন হেটে যাচ্ছে। কিন্তু কেউই সুভাসিনীর দিকে তেমন একটা খেয়াল করছেনা। বিড়ালটাও ক্ষুধার যন্ত্রনায় সুভাসিনীর দিকে তাকিয়ে মিউ মিউ করে ডাকতে লাগলো। সেদিকেও তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রাস্তায় বসে থেকেই সে সারাদিন পার করলো। কিন্তু কোনো মানুষই তার দিকে ফিরে তাকালো না।
সন্ধ্যার দিকে একটা বাচ্চা ছেলে সুভাসিনীর কোলের বিড়ালটাকে দেখে ছুটে কাছে আসলো। সুভাসিনী বাচ্চাটাকে দেখে চিনতে পারলো। এই বাচ্চাটা রাজীবদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকে। পৃথিবীতে এই বাচ্চাটা সুভাকে চিনতো। কিন্তু আরশি জগতের বাচ্চাটার কাছে সুভা পরিচিত না। আশ্চার্যের বিষয় বাচ্চাটার কাছে বিড়ালটা পরিচিত।
বিড়াল ছানাটিকে বাচ্চাটা বলল,"নিকী তুই এখানে। তোকে সেই সকাল থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।"
তারপর সে সুভার কোল থেকে বিড়ালটাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, "আমার বিড়ালটার খেয়াল রাখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। নিকী আপনাকে খুব বেশী জ্বালাতন করেনিতো?"
সুভাসিনী প্রতিউত্তরে কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলো না। সে ইশারায় মাথা নাড়িয়ে না বলল। তাই দেখে বাচ্চাটা বিড়ালটাকে কোলে নিয়ে হাঁটা শুরু করলো।
সুভাসিনী কিছুক্ষন স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। হঠাৎ তার মনে হলো এই বাচ্চাটার সাথে গেলে সে রাজীবের মত একই চেহারার মানুষটাকে খুঁজে পাবে। তাই বাচ্চাটা কিছুদূর যাওয়ার পরেই সুভাসিনী তার পিছু নিলো। বাচ্চাটার পিছে পিছে সুভাসিনী একটা একতলা বাড়ির সামনে এসে পৌছালো। বাচ্চাটা দরজা ধাক্কা দিতেই একটা ছেলে দরজা খুললো। ছেলেটা আর কেউ নয়, এ যেনো দেখতে হুবহু রাজীব, রাজীবের প্রতিবিম্ব। রাজীব ঠিকই বলেছিলো আয়নার অপর প্রান্তের দুনিয়ায় তার সাথে দেখা হবে। কিন্তু এই রাজীব কি সুভাসিনীকে চিনতে পারবে?
বাচ্চাটা ঘরে ঢুকে বলল, "ভাইয়া দেখো নিকীকে খুঁজে এনেছি।"
"সেটাতো দেখতে পারছি। নিকীর সাথে আর কাকে নিয়ে এসেছিস?"
"ওও, উনি আমার নিকীকে খুঁজে দিয়েছে।"
"তুই ভিতরে যা নিকীর সাথে খেলা কর। নিকীকে খাবার খেতে দাও। আমি উনার সাথে কথা বলি।"
বাচ্চাটা ঘরের ভিতরে ঢুকে গেলো।
সুভাসিনী রাজীবের প্রতিবিম্বের দিকে অনেক সময় ধরে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইলো। কীভাবে একজন মানুষ হুবহু দেখতে আরেকজনের মতো হতে পারে। দুজনে একে অপরের দিকে মন্ত্রমুগদ্ধের মত তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।নীরবতা কাটাতে রাজীব বলল, "আপনাকে কোথায় যেনো দেখেছি। ঠিক মনে করতে পারছিনা। আসুন ভিতরে আসুন।"
কথাগুলো শুনে সুভাসিনীর মুগ্ধতার ঘোর কেটে গেলো। সে প্রতিউত্তরে কিছু না বলে চুপচাপ ঘরে ঢুকলো।
সুভাসিনী একতলা বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো। বাড়ির মানুষগুলোর সাথে কথা বলতে লাগলো। তাদের সাথে মিশার চেষ্টা করতে লাগলো। এই বাড়ির মানুষগুলো পৃথিবীতে তার খুব চেনা মানুষ। অথচ এখানে দেখতেই শুধু তাদের মতো চেহারার। স্বভাবের দিক থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। এই যেমন আয়না দুনিয়ায় যে বাচ্চাটি বিড়াল নিয়ে সারাদিন মেতে থাকে সেই বাচ্চাটির পৃথিবীতে বিড়াল মোটেও পছন্দ নয়। আয়নার মধ্যে বসবাস করা রাজীব সায়েন্সের 'স' ও ভালোমত বুঝেনা। কিন্তু সুভাসিনী যাকে চিনতো সে সায়েন্স ছাড়া অন্য কিছুই বুঝতোনা।
তিনদিন যাবৎ সুভাসিনী আয়নার ভেতরের পৃথিবীতে বাস করছে। এই তিনদিনে রাজীবের সাথে তার শুধু চোখে চোখে কথা হয়েছে মুখ ফুটে সে কিছুই বলতে পারেনি। কিন্তু আজ তাকে কথা বলতেই হবে।
এদিকে রাজীব সুভার আচরন দেখেই বুঝে গেছে এই মেয়েটা তাদের পৃথিবীর কেউ নয়। বাসার সবাই সুভাসিনীকে নিয়ে যেভাবে ব্যাস্ত হয়ে আছে তাতে তার সাথে একলা কথা বলার সুযোগ হয়ে উঠছে না রাজীবের।
সুভাসিনী জানে তাকে সাহায্য করার জন্য এই রাজীবই একমাত্র অবলম্বন। তাই সুভাসিনী সুযোগ খুঁজছে তাকে সব কিছু বলার। চতুর্থ দিন সকালে সেই সুযোগ সুভা পেয়ে গেলো। প্রচন্ড কৌতুহল থাকায় সুযোগটা রাজীবই তৈরী করলো। বাসায় সবার কাছে শহরে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে সুভাকে সাথে নিয়ে বের হলো। রাজীব আগে হাঁটছে সুভাসিনী পিছনে। যে রাস্তা দিয়ে সুভাসিনী হেঁটে এসেছিলো সেই রাস্তা দিয়েই তারা যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে তারা শহর ছাড়িয়ে জঙ্গলের কাছাকাছি পৌছাতেই রাজীব সুভাসিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি আমাদের দুনিয়ার কেউনা, তা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তুমি কোথার থেকে এসেছ?"
"আয়নার অপর প্রান্ত থেকে।"
কথাটা শুনে রাজীব হা হা করে অট্টহাসি হেসে বলল, "সায়েন্স ফিকশনের আষাঢ়ে গল্প শুনতে চাইনি । আমার সায়েন্স পছন্দ না।"
"সত্যি বলছি..."
সুভাসিনীকে কথা শেষ করতে না দিয়েই রাজীব বলল, "কেন এসেছো? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি নিশ্চয়ই কোন বিপদে পড়েছো।"
সুভাসিনী এবার তাকে সব কিছু খুলে বলল । তার সন্দেহ রাতুলই সব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী সেটাও জানালো । আয়না দুনিয়ার রাজীব তাকে সাহায্য করবে বলে জানালো । এরপর দুজনেই জঙ্গলের ভেতর মেশিনের কাছে গেলো । সুভা মেশিনটা দেখিয়ে বলল, "এই সেই মেশিন, এটাতে চড়েই আয়নার ভেতর দিয়ে আমি এসেছি।"
মেশিনের ভেতর দুজনে উঠে বসতেই মুহূর্তেই তা বিকট শব্দে চালু হয়ে গেলো। এবার মাটির দেয়াল ফেটে চৌচির হয়ে মেশিনটা তার ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়লো। পুনরায় ল্যাবের সেই বড় আয়নাটির সামনে এসে মেশিন থামলো।
রাতুল পাশের রুমে ছিলো। মেশিনের বিকট শব্দ শুনে সে চলে আসলো। সুভার কথা মতো রাতুলকে দেখে রাজীব মেশিন থেকে আগে নামলো। রাতুল আয়না দুনিয়ার রাজীবকে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। এটা কি করে সম্ভব রাজীবকেতো সে প্ল্যান করে মেরে ফেলেছে। তাহলে রাজীব বেঁচে গেলো কিভাবে? সে জানেনা এই দুনিয়ার মানুষের মত দেখতে অবিকল মানুষেরা আয়না দুনিয়ায় রয়েছে।
ভয়ে রাতুলের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে । ভীত গলায় সে বলল, "রাজীব তুই ! তুই বেঁচে আছিস!"
সুভা পিছন থেকে উত্তর দিলো, "হ্যাঁ বেঁচে আছে ।রাজীবকে দেখে তুমি ভয় পাচ্ছো কেনো রাতুল?"
"না আ আমিতো..."
সুভা আবারো বলল, "তুমিতো ভেবেছিলে তুমি রাজীবকে মেরে ফেলেছো । কিন্তু দেখো রাজীব তোমার সামনে সুস্থ সবল ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।"
"সত্যটা যখন জেনেই গেছো, তখন তোমাদের দুজনকেই একসাথে শেষ করে দেবো।" এই বলে রাতুল তার প্যান্টের পকেটের ভেতর থাকা রিভলবার বের করে রাজীবের দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লো ।
পরিশিষ্ট :
সুভাসিনী পেরেছে তার ভালোবাসার মানুষের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে, সেই সাথে তার ভালোবাসার মানুষের মতো অবিকল দেখা যায় এমন একজনের জীবন বাঁচাতে ।
সুভাসিনীর হারিয়ে যাওয়ার পিছনে রাতুলের হাত আছে তাই পুলিশ রাতুলকে ধরার জন্য ল্যাবে এসে দেখলো রাতুল পিস্তল হাতে দাড়িয়ে আছে আর কিছু দূরেই পড়ে আছে সুভাসিনীর রক্তাক্ত দেহ ।
সুভাকে দেওয়া কথা রাখতেই মেশিন নিয়ে রাজীব পুনরায় ফিরে চলে গেছে আরশি দুনিয়ায় । মেয়েটি নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছে তার জন্য, এই কষ্ট কখনই ভুলে যাবার নয় ।