গল্প: কৃতজ্ঞতা

যখন আমার জ্ঞান হলো তখন দেখলাম রাস্তা দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মেয়েটা আমাকে দেখে দৌড়ে আমার কাছে এসে বলল, 

"বাবু তোমার নাম কি? তোমার মা কোথায়? কথা বলো না কেনো?" 

তারপর আমার নাকের মাথায় আলতো করে আঙ্গুল রেখে বলল, "আমি যদি এখানে চাপ দেই তাহলে কি তুমি কথা বলবে?" 

এই বলে মেয়েটা হাসতে লাগলো।

কি সুন্দর মিষ্টি হাসি মেয়েটার। দেখে আমি খুশীতে মুখ দিয়ে আওয়াজ বের করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বের হলো না। মেয়েটা আমাকে এক হাতে কোলে তুলে নিয়ে আরেক হাতে তার গলায় পেঁচিয়ে রাখা লাল রঙের মাফলারটা খুলে সেটা দিয়ে আমার পুরো শরীরটা ঢেকে দিলো। আমার মাথায় আলতো করে কিছুক্ষন হাত বুলিয়ে দিলো।

"আমি তোমাকে আমার সাথে নিতে পারবো না। মা বকবে। তুমি এখানেই থাকো, তোমার মা এসে তোমাকে নিয়ে যাবে।" এই বলে আমাকে মাটিতে নামিয়ে রেখে মেয়েটা দৌড়ে চলে গেলো। 

আমি তার গমনপথের দিকে চেয়ে রইলাম অনেকক্ষন।

তারপর আমার আর কিছু খেয়াল নেই। 

অনেক পরে আবার যখন আমার জ্ঞান ফিরলো তখন দেখি আমাকে একটা ছেলে তার বাসায় নিয়ে এসেছে।

তারপর প্রায় অনেক দিন পেরিয়ে গেছে আমি ছেলেটার সাথেই আছি। ছেলেটার নাম সুদীপ্ত। তার পরিবারে বাবা ব্যাতীত আর কেউ নেই। বাবা আর ছেলে দুজনে মিলে আমার দেখাশোনা করে। 

সুদীপ্ত আমার নাম দিয়েছে নিকি। নামটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। যদি রাস্তায় পড়ে থাকতাম তাহলে হয়তো আমার কোনো নাম থাকতো না। আমি সারাদিন যা মনে চায় তাই চুরি করে খেতাম আর আশেপাশের মানুষেরা আমাকে মারার জন্য ধাওয়া করতো। এদিক থেকে আমার ভাগ্য খুব ভালো। আমি মানুষের বাসায় আছি, নিয়মিত পছন্দের সব খাবার পাচ্ছি, বাইরের গরম কিংবা ঠান্ডা কিছুই আমাকে স্পর্শ করতে পাচ্ছে না। এই জন্য আমি সুদীপ্ত এবং তার বাবার কাছে অনেক কৃতজ্ঞ। তাদের জন্য আমি আমার জীবন দিতেও রাজী আছি।

সুদীপ্ত সারাদিন বাসার বাইরে থাকে। প্রায়ই অনেক রাত করে বাড়ি ফিরে। তার বাবা সারাদিন বাসায় আমাকে নিয়েই সময় কাটায়। যদিও আমি বুঝতে পারি ছেলেকে নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই। আমারও সুদীপ্তের জন্য চিন্তা হয়। ছেলেটা কেনো তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে আমার সাথে খেলেনা সেটাই ভাবি।

আর এই চিন্তার ফাঁকেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া সেই বাচ্চা মেয়েটার কথা মনে পড়ে। অনেকদিন রাস্তায় বের হই নাই। তাই মেয়েটার সাথে দেখা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই।

তবে আজ রাস্তায় যাবো। মেয়েটাকে খুঁজে বের করার জন্য। 

সুদীপ্তের রুম থেকে বেরিয়ে মাঝখানের রুমে এসেছি। এখন সদর দরজার কাছে যেতে পারলেই হলো। 

আরে একি! সুদীপ্তের বাবা দেখি মেঝেতে পরে আছে! আমি কাছে গিয়ে দেখলাম তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। 

আমি জোড় গলায় চিল্লালেও কেউ আসবে না। এক কাজ করা যায়, সদর দরজাটা খুলে উনাকে কোনোভাবে বাইরে নেয়ার চেষ্টা। আমি অনেক কষ্টে নব ঘুরিয়ে দরজাটা খুলতে পারলাম। দরজা খুলে দেখি পাশের বাসার দরজায় এক মহিলা দাঁড়ানো। আমি মহিলার কাছে গিয়ে তার হাতে থাকা মাছের পোটলাটা মুখ দিয়ে টান দিয়ে ঘরের ভেতর দৌড়ে আসলাম। মহিলাটা আমার পিছু পিছু ঘরের ভেতরে চলে এসেছে। আমি সুদীপ্তের বাবা যেখানে পড়ে আছে ঠিক সেখানে এসে পোটলাটা মুখ থেকে নামিয়ে রেখে মহিলার উদ্দেশ্যে মিউ করে উঠলাম। 

মহিলাটা আমার কথা বুঝতে পেরেছে কিনা জানিনা, তবে তিনি সুদীপ্তের বাবাকে হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে তার পার্টস ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কাকে যেনো ফোন করলেন। 

প্রায় পাঁচ মিনিট পর একদল লোক এসে সুদীপ্তের বাবাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলো। আমিও তাদের পিছু পিছু বের হয়ে দেখি তারা একটা বড় সাদা গাড়ীতে করে তাকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম সুদীপ্তের বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমাকেও তার সাথে যেতে হবে তাই সাদা গাড়ীর পিছু পিছু রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছি। আমার একটা দায়িত্ব আছে না।

গাড়ীর সাথে দৌড়ে যেতে আমি পারলাম না। কিছুদূর যেতেই গাড়ীটাকে হারিয়ে ফেললাম। কারন আমি

 সেই বাচ্চা মেয়েটার দেখা পেয়েছি। মেয়েটা আমি যেদিক থেকে এসেছি সেদিকই যাচ্ছে। আমি তার পিছু নিয়ে দেখি, সে আমাদের পাশের বাসায় ঢুকছে। যে মহিলা আমাদের সাহায্য করেছেন তিনি মেয়েটার মা।

সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি বাসার দরজার সামনে দাড়িয়ে রইলাম। 

ঠিক অন্ধকার হয়ে আসার আগ মুহূর্তে সুদীপ্ত বাসায় এসে হাজির। সে আমাকে দরজার সামনে থেকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, "পাশের বাসার আন্টির কাছ থেকে শুনলাম তোর বুদ্ধির কারনে আজ বাবাকে সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তোর জন্য বাবা বেঁচে গেছেন।" আমি সুদীপ্তের গালের সাথে আমার গাল ঘষে চোখ বন্ধ করে রইলাম।

Post a Comment

Previous Post Next Post