গল্প: ইন্টারভিউ

 


রাতিন এসেছে ইন্টারভিউ দিতে শ্রী মঙ্গল চা বাগানে। পরীক্ষামূলকভাবে তাকে রাখা হলো অফিসার্স বাংলোতে। চা ঢোকার পর রাতিনের কাছে তা কেমন যেন গুমোট একটা ভাব লাগলো কারণ চা বাগানে কখনো কোন ভাবেই প্রবেশ করতে পারে না কিছু। একটা সিকিউরড এরিয়া। ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য হাতে আরও একদিন সময় আছে। রাতিন কে পুরনো বাংলো বাড়িতে আরো কয়েকজনের সাথে থাকতে দেওয়া হল। সবাই ক্যান্ডিডেট এবং রাতিনের মনে হল এরা তাদের কত আপন। দেশের এক একটি জেলা থেকে এসেছে। কেউ রাজশাহী, কেউ দিনাজপু্‌ পটুয়াখালী, পিরোজপুর তাদের কথাবার্তার একসেন্ট বা ধরন এক এক রকম।


তাদের প্রত্যেকের সাথেই ভালোভাবে কথা হল তাদের সবারই চাকরির খিদে আছে কারণ তাদের টাকা পয়সা দরকার। তাদেরকে নিয়ে প্রজেক্ট মানে চা বাগানের বিভিন্ন জায়গা গুলো ঘুরে দেখানো হলো বিকালে। এক একটা রকমের চা পাতা হয়। এর কোন কোনটার গ্রেড এক থেকে দশের ভেতর থাকে। অত্যন্ত কষ্ট লব্ধ এক জিনিস এই চা পাতার গ্রেড নির্ধারণ করা। সেখানে তারা বেছে বুছে সেগুলো ঠিকঠাক মতন করে নেয়। সেদিনকার মত ঘুরেফিরে শেষ দিকে বাংলাতে ঢুকলো।


রাতিন খুব ভালোভাবেই জানে এই চা বাগান গুলো কোন কোন জায়গা খুব ফ্রন্ট্রেট থাকে রাতিনের তার কথা সেটা সে বুঝতে পারছে কেমন যেন লাগছে কারণ এই চা বাগানে আসার পর গুমোট ভাব আছে কিন্তু কোন ধরনের ভীতিকর বিষয় তার চোখে পড়েনি। রাতিনকে যে জায়গায় থাকতে দেওয়া হয়েছে সেই জায়গাটা আসলে একটা বাংলোর অংশ বলা যায়। কিন্তু সম্প্রতি কোন ধরনের একটা মডিফিকেশন আনা হয়েছে এখানে দেখা যাচ্ছে তিনটে নতুন খাট আনা হয়েছে।

"আচ্ছা, রাতিন ভাই এরকম দূরের জায়গায় আপনি কেন চাকরিটা করবেন? আমারে বলেন তো!" পাশের বেডের ইজাজের কথা শুনে রাতিন একটু হেসে দিল। বলল, "না করার কি আছে? আমি তো না কিছু দেখছি না।" রাতিনের দিকে তাকিয়ে ইজাজ বলল, "ভাই জায়গাটা কেমন যেন একটা গুমোট ভাব গুমোট ভাব লাগছে। যাযই কিছু বলেন ভাই এখানে কোন না কোনো, কিছু না কিছু একটা আছেই।"

সত্যিই ভয় হওয়ার কথা। কারণ একটা টি স্টেট মানে একটা বিশাল অঞ্চল এবং সেটা একটা ছোট অন্যান্য চা বাগান থেকে যদি অনেকগুলো চা বাগান থাকে তাহলে। একটা চা বাগানে কতগুলো টিলা থাকতে পারে সেটা তো আসলেই ভেবে দেখার বিষয়। খুব শক্তপোক্তভাবেই দেখা যাচ্ছে রাতিন সেই উদ্দেশ্যেই এসেছে।


এসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে রাতিনের মনে পরল গার্লফ্রেন্ডকে তো কল করাই হয়নি। নোটবুকের স্ক্রিনটা তুলে অন করেই কল দিল গার্লফ্রেন্ডকে মেসেঞ্জারে।


গার্লফ্রেন্ড ১০ সেকেন্ডের মধ্যে কলটা ধরল। বলল, "একেবারেই ভুলেই গেছিলে আমাকে নবাবের বেটা লাট সাহেব। এখন চাকরির জন্য খুব দৌড়াদৌড়ি করছেন না?"


জবাবে রাতিন বলল, "কি যে বলো না। আজকে অনেক খাটাখাটনি গিয়েছে বাবা! অনেক হেঁটেছি। পুরো চা বাগানে অর্ধেক ঘোরা হয়ে গেছে আমি অনেক জায়গায় ঘুরেছি।"


রাতিনের দিকে তাকিয়ে তার গার্লফ্রেন্ড লিনা  বলল, "তোমার আশেপাশে তো দেখি কয়েকজন মানুষকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে তখন রাত্রেবেলা এই যে এরা আমার রুমমেট আর কি। তখন লিনা বলল বাহ বেশ তোমার রুমমেট হয়ে গেছে?"


রাতিন বলল, "একচুয়ালি এরা আমার আমার সাথেই পড়েছে ক্যানডিডেট হিসেবে। কাল আমাদের পরীক্ষা হবে কিনা দুপুরের আগে তখন সেখানে রিটার্ন আছ্‌ ভাইবা ও হয়তো নিতে পারে।"


এরপর লিনার কাছ থেকে রাতিন বিদায় নিয়ে শুভরাত্রি বলে ঘুমিয়ে পড়বে বলল। 

"আমিও শুয়ে যাব।"


লিনা বলল, "ঘুমিয়ে পড়ো আমার ও ঘুম পাচ্ছে খুব ঘুমিয়ে যাব।"


পরদিন রিটেন টেস্ট দিয়ে লিনা কে কল করলো রাতিন। বলল, "আজকে খুব ভালোভাবে পরীক্ষা দিয়েছি। ওরা খুশি হলো বলেই মনে হচ্ছে কারণ চা বাগানের ম্যানেজার এক্সাম হলে গেলে আমাকে দেখে বলল এই বান্দাকে কখনো হাতছাড়া করা যাবে না।


রাতে লিনাকে সবার সাথেই পরিচয় করে দিল রুমের ক্যান্ডিডেট দের। এর মধ্যে দুইজন যখন তার সাথে কথা বলল তারা বেশ খুশি। তার সাথে কথা বলল একে তো রুমমেট এর গার্লফ্রেন্ড তার পর দেখতে সুন্দর কথা একটু বাড়িয়ে নেওয়া গেলেই কি। লিনা সবার কাছ থেকে বিদায় নিল।


সেই রাতেই লিনার কাছ থেকে একটা কল এলো রাতিনের মোবাইলে।রাতিনের মনে হল লিনা ওকে খুব মিস করছে। তাই সে কল করেছে এ অবস্থায়। রাতিন এতটাই খুশি হয়েছে যে তার অবস্থা বুঝিয়ে বলার মত নয়।


রাতিনের গার্লফ্রেন্ড তাr কল রিসিভ করার সাথে সাথে বলল, 'রাতিন তুমি তোমার বুকটা ওপেন করে রেখে ঘুমিয়ে গিয়েছিলে। তোমার ওখানে আরো একজনের সাথে সম্ভবত পরিচয় করাও নি। তিনি তোমার নোটবুক থেকে আমাকে কল দিয়েছেন। আমি তার সাথে দুই মিনিট কথা বলার পর বেশ বিরক্ত লেগেছে আমার কাছে। রাতিন তখন নোটবুকটা ওপেন করল. সাথে লিনা কে বলল, "তুমি অফ ছিল তাহলে এটা অন করল কে এখানে?" 

তখন রাতিনকে লিনা জিগ্যেস করল, "তোমার সাথে কয়জন আছে এখন রুমে?"

রাতিন বলল, "তিনজন আমি সহ।"
লিনা বলল, "তুমি ভুল বলছো। তোমরা চারজন রুমে আছো। বেশ ভয় পেয়ে গেল রাতিন বললো। ইম্পসিবল আমার সাথে এই অবস্থায় তিনজন। আমি সহ আরো দুইজন। মোট তিনজন আছি আমরা এখানে।"


হঠাৎ করেই লিনা চিৎকার দিয়ে উঠল। "রাতিন তোমার পিছনেই তো একজন দাঁড়িয়ে আছে। ওই তো আমার সাথে কথা বলেছিল।" 


রাতিন ঘাড় ফিরিয়ে দেখে ওখানে কেউ নেই। লিনা বলতে শুরু করল, "রাতিন তুমি কি কোথায় গিয়েছো? আমাকে জানাও। কারণ, এটা খুব বাজে জায়গা।"

রাতিন ঘাবড়ে গেল। বলল, "আমার সাথে তো আজকে দুই দিন ধরে এমন কিছু হয়নি। এখন কেন হচ্ছে?" 

রাতিনের গার্লফ্রেন্ড বলল, "তুমি আর যেটাই হোক এসব জায়গায় আর কখনো যাবেনা।"


লিনা বলল, ""রাতিন তোমার বন্ধুরা কোথায়? 

রাতিন বলল, "ওরা তো একটু খাওয়ার অভ্যাস আছে তো সেজন্য বাইরে গিয়েছে। তখন লীনা পরলো মানে তুমি ওদেরকে ছাড়া তুমি রুমে একলাই শুয়ে আছো? আমার ভয় করছে রাতিন।"


রাতিন বলল, "দূর কিছু হবে না। তুমিও ভয় পাচ্ছ কেন  মিছিমিছি। 

রাতিনের দিকে তাকিয়ে লিনা বলল, "রাতিন তুমি বুঝতে পারছ না যে কোন সময় যেকোনো কিছু হতে পারে। ওই যে লোকটা আবার এসেছে তোমার পিছনে।" 

রাতিন পিছনে ঘুরে দেখল। "লোকটা কোথায়?" 


তখন রাতিনের কথা শুনতে লিনা বলল, "ওই যে রাতে দেখা যাচ্ছে লোকটা। তোমার একদম কাছে চলে এসেছে।"


রাতিন এবার ঘাড় ফিরিয়ে সত্যিই ভয় পেল। কারণ সে কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। তার মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার দশা।


এমন সময় লিনা আরো একটা চিৎকার দিয়ে উঠল। সে বলল, "রাতিন লোকটা তোমাকে মারার জন্য পেছনে ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে!"


পরদিন সকালে পুলিশ এসে ঘর থেকে গলা আলাদা করে ফেলা লাশ উদ্ধার করল।

Post a Comment

Previous Post Next Post