আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজেকে দেখে নিচ্ছে আরিফ। মুখে হালকা চাপ দাঁড়ি, সাদা শার্ট, লাল টাই পরিহিত আরিফকে দেখে সুদর্শন যুবক মনে হচ্ছে। যেকোনো মেয়েই তার এই রূপে মুগ্ধ হতে বাধ্য। কিন্তু কখনও কখনও সুদর্শনতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে ভিন্ন এক চেহারা।
তিন মাস আগের কথা।
শহর থেকে বহুদূরে নদীর তীরে অবস্থিত মিসিসিপি গ্রাম। নদীর তীর ঘেষেই অধিকাংশ মাঝি ও জেলে পরিবারের বাস। সেখানেই একটা কুঁড়েঘরে ছোটন তার পরিবারের সাথে থাকে। ছোটনের বাবার নিজস্ব নৌকা নেই। সে অন্য জেলেদের নৌকায় দাঁড় বাইবার কাজ করে। বাবার সাথে ছোটন ও মাঝেমধ্যেই দাঁড় বাইতে যায়।
অনান্য দিনের মত সেদিন বিকালেও পাশের ঘরের হারু মাঝির নৌকা নিয়ে বের হয় ছোটন ও তার বাবা।
বিকালের দিকে শহর এলাকা থেকে অনেক লোকই ঘুরতে আসে নদীর পাড়ে। তাদেরকে নৌকায় করে ঘুরাতে পারলে কিছু বাড়তি পয়সা আয় করা যায়। ছোটনের বাবা এই বাড়তি পয়সা কামাইয়ের সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়না। তবে তার আফসোস একটাই নিজের একটা নৌকা থাকলে এই পয়সার ভাগ অন্যদের দিতে হতোনা। নদীর পাড়ে নৌকায় যাত্রীদের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় ছোটনের বাবা নিজের একখানা নৌকা থাকলে কি হত তাই ভাবছিলো।
ঠিক এমন সময় সাদা শার্ট পরিহিত এক যুবকের ডাকে তার ভাবনার ঘোর ভেঙ্গে গেলো।
সেই যুবক বলল, চাচা ঐ পাড়ে গিয়ে কিছুসময় ঘুড়ে ফিরে আবারো চলে আসবো। ভাড়া কত নিবেন। ছোটনের বাবা বলল যাওয়া-আসা তিনশো দিবেন। অন্য যাত্রীরা হলে এই ভাড়া নিয়ে মূলামূলি করে কমানোর চেষ্টা করতো, তবে এই যুবক তা না করেই যেতে রাজি হয়ে গেলো। ছোটনের বাবা এজন্য মনে মনে বেশ খুশি হলেন।
কিছুক্ষণ পরে সেই ছেলেটা একটা সাদা-লাল শাড়ী পড়া মেয়েকে সাথে নিয়ে নৌকায় উঠে ছাউনির ভেতরে বসলো। তারা নৌকায় উঠার পরেই ছোটন এবং তার বাবা দুজনে মিলে দাঁড় বাইতে লাগলো।
পরেরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ছোটন তার কয়েকজন বন্ধুর সাথে মিলে গেলো নদীর ঘাটে মুখ ধুতে। হঠাৎই তাদের চোখে পড়লো নদীর পাড় ঘেসে সাদা বস্তার মতো কিছু একটা ভেসে যাচ্ছে। কৌতুহলী হয়ে ছোটন ও তার বন্ধুরা মিলে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে নেমে গিয়ে বস্তাটাকে পাড়ের দিকে টেনে নিয়ে আসলো।
বস্তার মুখটা একটা শক্ত নাইলনের দড়ি দিয়ে বাঁধা। ঘাটের চারপাশে উৎসুক মানুষদের ভীড় জমে গেলো। বস্তার ভিতরে কি আছে সবাই দেখতে ইচ্ছুক।
বস্তার মুখের বাধনটা খুলতেই ভুক ভুক করে সকলের নাকে একটা পঁচা গন্ধ লাগলো। গন্ধ শুকেই অনেকে বলতে লাগলো বস্তার ভিতরে যাই থাকুক না কেনো সেটা বের না করে বরং পুলিশে খবর দেওয়া উচিত। তবুও ছোটনের বন্ধুরা বস্তাটাকে উপুড় করে ভেতরে কি আছে তা বের করলো। বস্তার ভিতরের জিনিস দেখে ছোটনের মাথা চক্কর দিয়ে গা গুলাতে শুরু করলো। কিছু সময়ের মধ্যেই সেখানে পুলিশ এসে হাজির হলো।
প্রতিদিন সকালবেলা খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস সারার। তবে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থার খবর সে যতটা না পড়ে আজকাল তার চেয়ে বেশী রহস্য, খুনখারাপি, ধর্ষনের খবর গুলো খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ে। কারন গোয়েন্দা গল্পকাহিনীর বইগুলো পড়ে পড়ে আজকাল তার গোয়েন্দা হওয়ার শখ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
আজকের পত্রিকার শেষ পাতায় খবরের হেডলাইনটা দেখে তার চোখ আটকে গেলো। রূপসা নদী থেকে এক তরুনীর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার।
খবরটা সে বেশ মনোযোগের সাথে পড়ছিলো ঠিক এমন সময় তার ফোনে আলো আন্টির নম্বর থেকে কল আসলো।
গত তিন মাস যাবৎ মেয়েটার সাথে পরিচয় আরিফের। মেয়েটার গায়ের রং শ্যামলা। তবে তার চোখগুলো বেশ মায়াবি, হাসিটাও বেশ সুন্দর। ঐ মিষ্টি হাসি আর মায়াবী চোখগুলো দেখলে দুনিয়ার অন্যসব কিছু অনায়াসেই ভুলে থাকতে পারে আরিফ। এর আগে আরো কত মেয়ের সাথেই পরিচয় হয়েছিলো আরিফের। সবাই নজড়কাড়া সুন্দরী ছিলো কিন্তু কারো চোখে এরকম মায়া সে কখনও দেখেনি। কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু সময়ের জন্য তার হৃদকম্পন থেমে যায়নি। তবে এই মেয়েটার চোখের দিকে তাকালে তার হার্টবিট মিস হয়ে যায়। মেয়েটার চোখ, মেয়েটার মিস্টি হাসি এ সবের জন্যই বোধ হয় আরিফের মনের মধ্যে মেয়েটাকে নিয়ে অন্যরকম এক অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে। অনুভূতিটাকে ভালবাসা ও বলা যেতে পারে।
এই মেয়েটার জন্য সব কিছু ছেড়ে দেয়া যায়, এমনকি হাসিমুখে নিজের জীবনও দিয়ে দেয়া যায়। তাইতো মেয়েটাকে ভালবাসার কথাটা সে বলে দিবে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে আর এসবই ভাবতে থাকে আরিফ।
আজ মেয়েটার সাথে তার দেখা করার কথা। তাইতো নিজেকে এতো পরিপাটি পরিচ্ছন্ন করে নিচ্ছে সে।
জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো মেয়েকে ভালবাসলো আরিফ। তাইতো সে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে নিজের উদ্দেশ্যেই ক্রুর হাসি হেসে জোর গলায় বলে, আরিফ শেষ পর্যন্ত তুই একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে গেলি? মেয়েরা কি পরিমান ছলনাময়ী হয় তুইতো জানিসই! তারপরেও প্রেম করে ঘর বাধার স্বপ্ন দেখছিস তুই! তারপর নিজের কথার প্রতিউত্তরে নিজেই বলে, আরিফ সব মেয়ে ছলনাময়ী হয় না, কিছু মেয়ে অনেক ভালবাসা দিতে জানে।
তারপর আবার নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে
তাহলে কিলিং কে করবে?
ঠিক এরকম সময়ে তার ফোনের রিংটন বেজে উঠলো। ফোন রিসিভ করতেই অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো সুমধুর কোকিলকন্ঠ।
আরিফ তার বাকীজীবন এই কন্ঠস্বর শুনেই কাটিয়ে দিতে চায়।
আজই সারা প্রথমবারের মতো কোনো ছেলের সাথে সারাদিনের জন্য ঘুরে বেড়াতে যাচ্ছে। বিগত তিন মাস যাবৎ ছেলেটার সাথে তার পরিচয়। ছেলেটা এতোই সুদর্শন যে তার মতো শ্যামলা কালো মেয়ের সাথে এরকম ছেলে মানায়না বললেই চলে। একটু আগেই ছেলেটার সাথে কথা হয়েছে তার। ছেলেটা তার বাসার সামনে এসে তাকে পিক করে নিয়ে যাবে। কোথায় ঘুরতে যাওয়া হচ্ছে তা অবশ্য ছেলেটা তাকে জানায়নি, কিন্তু সারা ঠিকই জানে তারা আজ কোথায় যাচ্ছে। বের হওয়ার আগে শেষবারের মতো সারা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের উদ্দেশ্য একটা মিস্টি হাসি দিলো। তারপর ড্রেসিং টেবিলের উপরে রাখা ক্লোরোফোমের বোতল এবং পকেট নাইফটা হ্যান্ডব্যাগে ভরে নিলো।
বাসা থেকে বেরিয়ে মোড়ের দোকানটার সামনে দাঁড়ালো সারা। পাঁচ মিনিট পরেই একটা কালো রঙের মার্সিডিজ এসে তার সামনে থামলো। গাড়ির ডান সাইডের দরজাটা ভেতর থেকে খুলে দিতেই সে গাড়িতে উঠে বসলো।
সাদা-লাল কম্বিনেশনের শাড়ীতে বীথিকাকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে। চোখে গাঢ় করে কাজল দিয়েছে সে। কাজল দেয়া চোখ আরিফের পছন্দ। আজ বিকালে আরিফের সাথে তার ডেটে যাওয়ার কথা। এখনও বিকাল হতে অনেক দেরী। তবুও বীথিকা আগে থেকেই সেজেগুজে তৈরী হয়ে নিচ্ছে।
আরিফ বলেছে, আজ রাতে তাদের ফিরতে দেরী হতে পারে। বীথিকার বাসার কেউ অবশ্য এই ব্যাপারে কিছুই জানেনা। কারন সে হোস্টেলে থাকে।
সে তার বান্ধবীদেরকে কল দিতে লাগলো কারন
যদি তাকে ফোন দিয়ে বাসার কেউ না পায় তাহলে তার বান্ধবীদের কাউকে ফোন দিলে তারা যেনো বলে দেয় সে তাদের সাথেই আছে।
আলো আন্টির ফোন রিসিভ করে সারা যা শুনলো তা সে কখনও ভাবতে পারেনি। তার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী বীথিকা এই দুনিয়াতে নেই। তিনদিন আগেও সে তার বান্ধবীর সাথে ফোনে কথা বলেছিলো। আর আজ সে জানতে পারলো সেদিনই তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। সারা তখনই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো যেভাবেই হোক বীথিকার খুনিকে সে খুঁজে বের করবেই।
ফোন রেখে পত্রিকার খবরটা ভালোমত পড়া শেষ করে সারা প্রয়োজনীয় সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লো।
নদীর ঘাট থেকে বাড়ি ফিরেই ছোটন বিছানায় শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষনের মধ্যে তার শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এলো। জ্বরের ঘোরেই ছোটন বলতে লাগলো, মানুষ এতো খারাইপ ক্যামনে হয়? কি সুনদর পরীর লাহান মাইয়াডারে ক্যামনে মারি ফেলছে? আমরা তখন কেন দেখলাম না, মাইয়াডারে বাঁচাইতে পারলাম না আমরা। বাঁচাইতে পারলাম না। ছোটনের মা বাহিরে কাজে গিয়েছিলো। কাজ শেষে ঘরে ফিরে ছেলের এই অবস্থা দেখে মাথায় পানি ঢালতে লাগলো।
আজকে নিয়ে দুইদিন যাবৎ ছোটনের শরীরে জ্বর। আজ সে গতদিনের চেয়ে সুস্থবোধ করছে। বিকালের দিকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাজের খোঁজে নদীর ঘাটের দিকে গেলো ছোটন। তাদের অভাবের সংসারে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে থাকাটা মোটেও মানায়না। ঘাটের কাছে গিয়ে দাঁড়ানো মাত্রই একটা মেয়ে ছোটনের কাছে দৌড়ে আসলো। মেয়েটা ছোটনের হাতে একটা ছবি দিয়ে বলল, দেখতো এই মেয়েটাকে তিন চার দিন আগে এখানে দেখেছো কিনা?
ছোটন ছবিটা দেখে ভয় পেয়ে গেলো। এইতো সেই মেয়েটা যার লাশ পাওয়া গেছে। ঐদিন মেয়েটা তাদের নৌকাতেই একটা সুদর্শন ছেলের সাথে উঠেছিল। তবে ফেরার সময় ছেলেটা একাই তাদের নৌকায় করে ফিরেছে।
নদীর ঘাটে পৌছে আরিফ নৌকা ভাড়া করতে গেলে ছোটন আগ বাড়িয়ে এসে তাদেরকে যাত্রী হিসেবে নিয়ে নিলো।
আরিফ যদিও ছোটন ও তার বাবাকে চিনতে পারেনি। কিন্তু ছোটন আরিফকে ঠিকই চিনতে পেরেছিলো। এমনকি তার সাথে থাকা মেয়েটাকেও সে চিনে। আজ ছোটন এই মেয়েটার উপকার করবে। সে কোনো ক্ষতি হতে দিবেনা।
মিস্টি মেয়েটার সাথে আজ সারাদিন নৌকায় চড়ে ঘুরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আরিফ। তাই নৌকায় উঠেই আরিফ ছোটনকে বলল, আজকে সারাদিন ঘুড়ার জন্যই আমরা তোর নৌকা ভাড়া নিচ্ছি। কথাটা শুনে ছোটন তার বাবাকে বলল, বাজান তুমি অন্য কোনো জেলে নৌকার সাথে কাজ করতে যাও, আমি হেগোরে ঘুড়ায় আনি। তা অইলে কয়ডা বাড়তি টেহা আয় হইবো। ছোটনের বাবা, ঠিকই কইছোসরে বলে নৌকা থেকে নেমে গেলেন। তারপরেই ছোটন নৌকা ছেড়ে দিলো।
নদীর পাড় আসার সময় সারারাস্তা আরিফ একাই বকবক করেছে। মেয়েটা তখনও চুপচাপ বসে ছিলো এখন নৌকায় ওঠার পরও মেয়েটা চুপচাপ বসে আছে। আরিফের বিরক্ত লাগছে। মেয়েটা এতো কম কথা বলে কেনো? অন্য মেয়েরা হলে এতো বেলা গল্প করতে করতে কান ঝালাপালা করে ফেলতো।
নীরবতা ভেঙ্গে আরিফই বলল,
তুমি সবসময় এতো চুপচাপ থাকো কেনো? আমার চুপচাপ থাকা মেয়ে ভালো লাগেনা।
মেয়েটি পাল্টা প্রশ্ন করলো, আপনার ভালো না লাগলে আমি কি করবো বলেন?
কি করবে মানে? তুমি গল্প করবে আমার সাথে। তোমার মুখে গল্প শুনলেই আমার ভালো লাগবে।
এবার মেয়েটি প্রতিউত্তরে কিছুই বললোনা। সে ভালো মতই জানে আরিফ মিথ্যা বলছে। বেশী কথা বলা মানুষ তার পছন্দ না। এই তিন মাসে আরিফের উপরে সে বেশ ভালোমতই নজরদারী করেছে। আরিফের পছন্দ অপছন্দ খুটি নাটি সবই সে জানে। শুধু জানেনা সে কেনো মেয়েদের প্রতি প্রচন্ড ঘৃনা পোষন করে?
নৌকার ছাউনির ভেতরে বসে থাকা অবস্থায় হঠাৎই ছেলেটি সারার হাত ধরে বলে, ভালবাসি তোমাকে।
আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে তারপর জানাবো, সারা বলল।
কবে জানাবে?
আমাকে দুই তিনদিন সময় দাও।
আমি আশা করি তোমার উত্তর হ্যাঁ হবে। এই বলে ছেলেটা সারার ধরে থাকা হাতে হালকা একটা চুম্বন খায়। সে সাথে সাথেই নিজের হাতটা ছেলেটার হাতের বাধন থেকে ছুটিয়ে নিয়ে তার থেকে দূরে সরে বসে। কিছুক্ষন পরে ছেলেটা সারার কাছে এসে বসে আবারো হাতটা ধরে।
আরিফের সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। এই প্রথম সে কোনো মেয়ের প্রতি সত্যিই আকৃষ্ট হয়ে এরকম কাজ করেছে। মেয়েটাকে প্রপোজ করার পর যখন মেয়েটা ইনডাইরেক্টলি না করে দিয়েছিলো তখন আরিফের খুব রাগ হচ্ছিলো। ইচ্ছা করছিলো মেয়েটাকে তখুনি মেরে ফেলতে। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রন করে মেয়েটার কাছে গিয়ে বসে তার হাতটা ধরে চোখের দিকে তাকালো। মায়াবী নেত্রযুগলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে তার ভিতরে আরিফ ডুবে যেতে লাগলো। প্রথমে তার প্রপোজ গ্রহন না করলেও আরিফের এই তীব্র অনুভূতির কাছে শেষ পর্যন্ত মেয়েটা নতি স্বীকার করে নিলো। কাজ শেষে আরিফ মেয়েটার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, হবে নাকি আরো একবার।
মেয়েটা উত্তরে কিছু না বলে তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে অনেকগুলো টিস্যু বের করলো। একটা দিয়ে সে নিজের শরীর মুছতে লাগলো। আর বাকিগুলো আরিফের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নিন ঘাম মুছে ফেলুন।
টিস্যু গুলো দিয়ে সে ঘাম মুছতে লাগলো। একটা টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মোছার সময় তার নাকে মিস্টি একটা ঘ্রান এসে লাগলো। আরিফের মনে হচ্ছে এই মিস্টি ঘ্রানটা যেনো তার শরীর ধীরে ধীরে অবশ করে দিচ্ছে, তার দৃষ্টি ঘোলা হয়ে আসছে। তাই সে মেয়েটার কোলের উপরে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।
ছেলেটা সারার কোলের উপরে মাথা রেখে শুয়ে আছে। তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ফেরেশতার মতো পবিত্র। অথচও এই পবিত্র সুরত নিয়েই এই ছেলেটা মেয়েদের প্রতি মনে পুষে রাখা ঘৃনার জন্য এই পর্যন্ত ত্রিশজন মেয়েকে ভালবাসার কথা বলে খুন করেছে। সব কিছু জেনেশুনেই সারা এই শিকারী বাঘের ডেরায় পা দিয়েছে। ক্লোরোফম দেয়া টিস্যুতে কাজ হয়ে গেছে। তাই সারা সাহস করে ব্যাগ থেকে পকেট নাইফটা বের করে ফেললো। যে মেয়েটার কারো শরীর কেটে রক্ত বের হতে দেখলে খারাপ লাগে সে আজ একজন ঘাতককে নিজ হাতে রক্তাক্ত করবে।
মেয়েটার মায়া ভরা চোখের দিকে ঘোলাটে দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতে বেশ ভালো লাগছে আরিফের। হঠাৎই আরিফের মনে হলো তার শরীরের কোনো একটা জায়গায় ধারালো কিছু দিয়ে খোচানো হচ্ছে কিন্তু তার বেশ ঘুম পাচ্ছে বিধায় সে বুঝে উঠতে পারছেনা তার সাথে কি হচ্ছে।
জ্ঞাণ হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে আরিফ দেখলো মেয়েটা হাসি মুখে একটা রক্ত মাখা ছুরি হাতে নিয়ে বসে আছে।
দুইদিন পরের কথা। পত্রিকায় ছাপা হয়েছে রূপসা নদী থেকে ছুরিকাঘাতে আহত এক যুবকের লাশ উদ্ধার। খবরটা দেখে সারা প্রথমে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো, আবার পর মুহূর্তেই সে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কারন বীথিকার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সে নিজ হাতে নিজের ভালবাসাকেও বলি দিয়েছে।
আরিফ সারাকে সত্যিই ভালবেসেছিলো। কিন্তু পূর্বের পাপের শাস্তিস্বরূপ শেষ পর্যন্ত তাকে ভালবাসার মানুষটার হাতেই বলি হতে হলো।
