ছুটির দিন। বিকেলেও বেকার সময় কাটে , ঘুরাঘুরিও তেমন হয়
না। হওয়ার মধ্যে শুধু হয় আড্ডা দেওয়া, হাটাহাটি।
আজকেও কোনো কাজ নেই বিকেলে।আমি থাকি বাংলাদেশ
ধাণ গবেষণা ইনস্টিটিউট গাজীপুরে। যারা গাজীপুরে থাকেন তারা জানেনই যে ধাণ গবেষণার
ক্যাম্পাসের পাশেই কৃষি গবেষণার ক্যাম্পাসে। সবাই মিলে হাটতে হাটতে কৃষি গেইটের সামনে যাই। সবাই
এর মধ্যের রয়েছে দ্বীপ ,রুহান আর আমি এই তিনজন। কৃষি গেইটের সামনে এক চাচা একটি ছোট ভ্যান নিয়ে বসে যেখানে তিনি চা বিক্রি করে।
ওনাকে সবাই
চিনে। যারা চা খায় না তারাও চিনে। কীভাবে চিনে তা জানি না। আমরা যে এখান থেকে সচরাচর
চা খাই তা না, কিন্তু আমরাও তার নাম জানি।
তার নাম সবাই জানে এই কারণে কারণ তিনি এদিকে চা নিয়ে বসে তার জন্যে নয় বরং তার চাপার
জোড়ের কারণে। আজকে হাটতে হাটতে এদিকে এসে পড়েছিলাম , তার ভ্যান দেখে চা খেতে মন চাইলো
তাই তার দিকে এগিয়ে যাওয়া।
কাছে গিয়ে বললাম, “কী চাচা , ব্যাবসা কেমন চলে? চা
দেন দেখি আমাদের।“ আজই প্রথম তাকে এতো কাছ থেকে দেখা। এর আগে রাস্তা দিয়ে যাওয়া সময়
তাকে প্রায়ই দেখতাম। তিনি আমার প্রশ্নের কোনো উত্তরই দিলেন না, নিজ মনে চা বানাতে লাগলেন।
তার নাম যে মশকরা তার ভাবসাব দেখে মনেই হচ্ছে না। বরং তাকে অনেক গম্ভীর মনে হচ্ছে।
তার নামের সাথে তার কোনো মিলই নেই।
তিনি চা বানালেন
,আমাদের তিনজনের হাতে দিলেন। আকাশ মেঘলা।
রুহান জিজ্ঞেস
করলো, “ কী চাচা? মন খারাপ নাকি? “
দ্বীপ বললো,
”চাচার হয়ট চাচির কথা মনে পড়তেছে। “
আমরা তিনজনে
তখন হাসা শুরু করলাম।
“তোমাদের
চাচির সাথে বছরখানেক আমার সাথে যোগাযোগ নেই”, বললো মশকরা চাচা।
আমরা হাসা
বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলাম,”কেনো?”
মুচকি হেসে
উত্তর দিলেন, ”নিজের মেয়ে খুন করতে নিয়েছিলাম
বলে।“
আমরা একটু
চমকে উঠলাম। অবাক হয়ে আমরা তিনজন তিনজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। আমি মনে মনে ভাবলাম
যে লোকে তো তাকে চাপাবাজ বলে চিনে কিন্তু কেউ তো তাকে কখনো পাগল বলেনি।
“কী বলেন
চাচা?” , জিজ্ঞেস করলো রুহান।
“হ্যাঁ, জেনেও
নিজের মেয়েকে প্রায় মরতে দিয়েছিলাম প্রায়। অনেকদিন আগের ঘটনা।“
“কেন চাচা?
কি হয়েছিলো?”
“ তোমরা বিশ্বাস করবে না, শুধু শুধু জিগেস করো কেনো? এখানে
শুনে ওখানে গিয়েই বলবে সালায় চাপাবাজ।“
“ছি ছি চাচা!
কি বলেন ,না না । তা কেনো বলব? আপনি আমাদের
বয়সে কতো বড়!” বললো দ্বীপ।
রুহান জিজ্ঞেস
করলো , “ কী হয়েছিলো চাচা?”
এখন গুড়িগুড়ি
বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
চাচা যেনো
নড়েচড়ে বসলো,তারপর বলা শুউ করলো,”আমার ভিটে বাড়িটা অনেকটা এরকম যে একটি দোচালা ঘর।
ঘরের সামনে উঠোন ,উঠোন পার হয়েই একটি পুকুর। আমার মেয়ের জন্মের সময় আমার বউ মানে তোমাদের চাচী অনেকবার বলেছিলো সে এসময়টা
নিজের বাপের বাড়িতে যেতে চায়। আমি রাজি হয়নি। আমিই চেয়েছিলাম আমার সন্তান যেনো আমার
ভিটে ভাড়িতেই হোক। শেষমেশ আমার কথাই থাকলো।
বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে বউয়ের মা ,বোন এলো আমার মেয়ের ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়ে। আমি বাহিরে
অপেক্ষা করছিলাম। ভেতর থেকে যখন বাচ্চার কান্নার শব্দ পেলাম তখন আমার খুশি দেখে কে?
তখন আমি চেয়ার থেকে সোজা হয়ে দাড়ালাম । দাড়াতেই পুকুরটা চোখে পড়ে । পুকুরে চোখ পড়তেই
কিরকম যেনো একটা অবয়ব ডুব দিলো। তখন মাথায় কি আর সাতপাচ আসে! দুচোখ ভর্তি সন্তান হওয়ার আনন্দ।“
আমি বললাম,”
অইটা মাছ ছিলো। আপনার সন্তান হয়েছে ,মেহোমান আসবে। পুকুর থেকে মাছ ধরে খাওয়াতে হবে
না।এই ভয়ে হয়তো মাছটা আরোও গভীরে ডুব দিয়েছিলো।“
এটা বলার
পর দেখলাম মশকরা চাচা আমার দিকে আড় চোখে তাকালো
আর বিরক্তির সুরে বললো,” হ্যাঁ, হতেও
পারে।“ যাহ বাবা, মশকরা চাচার সাথে দেখি মশকরা করলে রাগ করে।
দ্বীপ বলল,
“ বাদ দেন চাচা। এর পরে কি হয়েছিলো বলেন।‘’
ততক্ষণে আমাদের
চা শেষ হোয়ে গেছে। এখন চানাচুর নিলাম চাচার থেকে। চাচা আবার বলা শুরু করলো,” হ্যা,আমার
মেয়ে হলো। সেদিন আমার শ্বশুর মশাইও এসেছিলেন। তিনি নাতনিকে দেখে খুশি হয়েছিলেন, হওয়াটাই
স্বাভাবিক। তিনি পরেরদিনই চলে গিয়েছিলেন কি একটা কাজে। যাওয়ার সময় আমাকে ভালোমতন বাবা
বাবা ডেকে বলে গেলেন যে ,” বাবা শুনো, এই পুকুরটা ভালো নয়। এটা ভরাট করে ফেলো। “ আমাকে
শ্বশুর মশাই একটু স্নেহ করেই কথা বলতেন। আমি
একটু রগচটা ছিলাম তখন। রাখলাম না শ্বশুর এর কথা। ধীরে ধীরে মেয়ে আমার বড় হতে লাগলো।
মেয়ের যখন চার বছর বয়স চলে তখন একদিন বাড়িতে এসেছিলেন
আমার শ্বশুর। আমাকে আবারও বাবা বাবা বলে ডেকে বললেন, “মেয়েকে দেখেশুনে রেখো। সন্ধ্যার
সময় যেনো পুকুরের দিকে না যায়। “ আমি উনার কথায় সায় দিয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলাম মেয়ে
আরেকটু বড় হলে পুকুরে মাছের পোনা ছাড়বো। রাতে
মেয়েকে নিয়ে মাছ মারতে যাবো। কয়েকদিন পর শ্বশুর মশাই চলে গেলেন। আমার তর সইলো না। পুকুরে
মাছের পোনা ছেড়ে দিলাম। তারপর অন্রকদিন চলে গেলো।
একদিন সকালে বৃষ্টি পোরেছে। মেয়ের তখন যা বয়স তখন কাদামাটি দিয়ে খেলারই বয়স। সারাবিকেল
দৌড়াদুড়ি করে কাদামাটি ভরা শরীরে বাড়ি ফিরলো।“
তখন খেয়াল
করলাম কল্পের গল্পের দুনিয়া ছেড়ে আমাদের এই বাস্তব দুনিয়ায়ও বৃষ্টি পড়ছে।
মশকরা চাচা
বলছিলেন,”তো ওর মা ব্যস্ত ছিলো সন্ধ্যার কোনো এক কাজে। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে গেলাম
পুকুরে গা ধুয়িয়ে দিবো বলে। পুকুরে একটি মাচা ছিলো। আমার মেয়ে সে মাচায় বসে পা পানিতে
ডুবিয়ে নড়াচড়া করছিলো। আমি তখন সোজা হয়ে লুঙ্গি গোছ দিচ্ছিলাম। বাচ্চা মেয়েকে গোসল
করানো মোটেও সোজা কাজ নয়। হুট করে জলে কিছু ভারি কিছু পড়ার শব্দ । আমি ঝট করে আমার
মেয়ে যেখানে বসে ছিলো সেখানে তাকালাম। আমার মেয়ে নেই। আমি এক অস্পষ্ট আর্তনাদ মুখ দিয়ে
বের হতে চাইলো। কিন্তু হলো না। আমি যেনো কয়েক সেকেন্ড থ হয়েই দাড়িয়ে ছিলাম। তারপর আমিও
পানিতে ঝাপ দিলাম। ঝাপ দেওয়ার সময় আমার মেয়ের
মায়ের নাম ধরে চিৎকার দিলাম। আমার বউ চিৎকার শুনে লাফিয়ে লাফিয়ে এলো। সে এসে দেখলো।
আমি পানিতে হাতড়াচ্ছি। আমার বউ এর বুঝতে দেরী
হলো না। ওর বাবা আমাকে যখন সাবধান করছিলো তখন ওয় শুনেছিলো। তার জায়গায় অন্য মহিলা হলে চিল্লিয়ে পাড়া মোহল্লা এক করে দিতো। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল আমি জানি
।আর কি যেনো বিড়বিড় করে বলছিলো। হয়তো কোনো এক প্রার্থনা জাতীয় কিছু যা ওর বাবা শিখিয়ে
দিয়ে গিয়েছিলো। অনেক খোজাখুজির পর আমার মেয়ে ভেসে উঠলো। আমার তখন আর কোনো আশা ভরসা
নেই। আমিও কাঁদা শুরু করলাম। মেয়েকে কোলে করে নিয়ে উঠোণে গেলাম। অড় মায়ের জবান বন্ধ
হয়ে গিয়েছে। আমি মেয়ের কাপড় বদলে দিলাম। ততক্ষণে
পাশের বাড়ির বৌদি এসে ওর হাতে তা দিচ্ছিলো। জানি না কি জাদু হলো মেয়ে আমার চোখ খুললো।
কয়েকদিন জ্বর ছিলো। পরে আমার শ্বশুর মশাই এলো। আমি ভাবছিলাম আমার মেয়ে পরে গিয়ে ডুবে
গিয়েছিলো। কিন্তু আমার শ্বশুর মশাই বললেন যে এটা দেও ভুতের কাজ । আমি তোমাকে অনেকবার
বারণ করা সত্যেও তুমি আমার কথা শুনোনি । কেনো ওকে নিয়ে সন্ধ্যায় ওখানে গিয়েছিলে। তিনি
আমার মেয়ের যত্ন নিয়েছিলন। বলা যায় তার আর তার মেয়ের যত্নেই আমার বেচে আছে। আজ অনেক
বড় হয়েছে। আমি সেদিন জেনেছিলাম আমার শ্বশুর মশাইকে যে তিনি অনেক বড় মাপের মানুষ। সাধারণ
কেও নন। অইদিনের পর থেকে আমার বউও আমার সাথে আগের মতন কথা বলে না। আমি টাকা পাঠাই নিয়মিত। আমার মেয়ের জন্যে, ও তার
মায়ের জন্যে।“
রুহান জিজ্ঞেস
করলো,”দেও ভুত আবার কি?”
মশকরা চাচা
বললো,” তোমাদের শহুরে ছেলেদের এই একটা সমস্যা , দেশী ভুতেদের চিনো না।এখন ভ্যাম্পায়ার
বললে ঠিকই চিনতে । দেও ভূত পুকুর-ডোবা, নদী এবং বিভিন্ন জলাশয়ে বসবাস করে। এরা লোকজনকে জলে ফেলে ডুবিয়ে মারে বলে বিশ্বাস করা হয়। জলাশয়ে স্নান করতে আসা মানুষদের একা পেলে এরা নীচ থেকে তাদের পা টেনে ধরে জলের গভীরে নিয়ে যায়। এতে করে সেই ব্যক্তি শ্বাসরোধ হয়ে মারা যায়।“
আমরা পরে চা
এর টাকা দিয়ে চলে গেলাম। চাচা বললো,”আবার এসো, আরোও অনেক ভুতের সাথে আমার দেখা আর আশ্চর্য্য
ঘটনা আচেহ শুনাবো নি।‘’
আমরা মাথা
নেড়ে কৃষি গেইট দিয় ঢুকতে আনসার আংকেল বললো,”
গল্প শুনলে বুঝি? কোনটা শুনালো? প্রথমে তো ওর মেয়ের গল্প শুনায়। আমরা খোজ নিয়েছিলাম
কিন্তু ও বিয়েই করেনি।“
শেষ কথাগুলা
আনসার আঙ্গেক জোড়ে জোড়ে বলছিল আমরা হাটতে হাটতে
দূরে চলে যাওয়ার কারণে।
