গল্প- মশকরা চাচা ও নিশির ডাক

সকাল থেকে বৃষ্টি। সারাদিন বাসায়ই বন্দি। জানালার পাশে বসে বসে বৃষ্টি দেখা আর ফোন হাতড়ানো ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। কিন্তু ফোন হাতড়াতেই বা  আর কতো ভাল্লাগে। বিকেলের দিকে বৃষ্টি একটু কমতেই রুহান কে দিলাম কল।

“কিরে রুহান । বের হবি নাকি?”

“ হ্যা, হওয়াই যায়। চল বের হই। তুই ধা্ন-কৃষি  সংযুক্ত গেইট এ আয়। আমিও ওখানে আসছি”

যাক , এখন একটু বের হওয়া যাবে। আমরা ছোট থেকেই ধান গবেষণার ক্যাম্পাসের বড় হয়েছি, এই ক্যাম্পাসেরই স্কুলেই ভর্তি হয়ে পড়েছি। ক্যাম্পাসে থাকার এই সুবিধা যে রাত দিন যেকোনো সময় বের হয়ে আরামে হাটাচলা করা যায়। না হলে রাতে বের হওয়া মুশকিল হতো। তবে ক্যাম্পাসে বড় হওয়াতে বাহিরে তেমন যাওয়া হয় না বলে যেনো আমরা ফার্ম এর মুরগি হয়ে গেছি। গাজীপুরের অন্যান্য ছেলেদের মতন  চালাক-চুতুর হয়ে উঠতে পারিনি। এসব ভাবতে ভাবতে ধা্ন-কৃষি  সংযুক্ত গেইট এর সামনে এসে পড়েছি। এসে দেখি রুহানও ছাতা নিয়ে নেমেছে, অপেক্ষা করছে আমার জন্যে। বাংলাদেশ ধাণ গবেষনা ইনস্টিটিউট আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পাশপাশি দুটি ক্যাম্পাস। যারা গাজীপুরে থাকেন বা চিনেন তারা তো জানেনই।তো আমরা এখন ধা্ন-কৃষি  সংযুক্ত গেইট এ অর্থাৎ ধাণের এই গেইট দিয়ে আমরা কৃষি তে হাটতে যাবো । আমরা বাংলাদেশ ধাণ গবেষনা ইনস্টিটিউট আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণাকে সংক্ষেপে ধাণ আর কৃষিই বলি । আবার মাঝে মাঝে ব্রি আর বারিও বলি।

রুহান বললো, “এই বৃষ্টির সময় না চা খেতে মন চাচ্চে রে।“

আমি বললাম ,”চল তাহলে দেরী কিসের। মশকরা চাচার ভ্যানের দিকে রউনা দেই।“


রুহান উৎসাহের সাথে চেচিয়ে উঠলো,”তুই আসলেই আমার বন্ধু,আমার মনের কথা কেমন বুঝে উঠলি।“

আমরা হাটা শুরু করলাম। মশকরা চাচার ভ্যান কৃষি গবেষণার মেইন গেইটের সামনে থাকে, সেখানেই তিনি চা বিক্রি করেন। রুহানের আলাপ শুনে যা বুঝলাম ওর মেইন মোটিব হচ্ছে এই বৃষ্টি বাদলের দিনে আষাঢ়ে গল্প শুনা। মশকরা ভালো আসড় জমাতে পারেন,তার সাথে তার হাতের চা।উফ! মশকরা চাচা যে সব পল্টি কথা কাহিনী বানান তা আমরা সকলেই জানি। তবে তার চাপার জোর অনেক। যখন বলবে তখন যেনো মনেহয় সবই সত্যি। বিশ্বাস না করে পারাই যায় না। সেইবার যা কাহিনী বানিয়ে শুনিয়েছিলেন প্রথমে তো বিশ্বাসই করে ফেলেছিলাম। কিন্তু অবসরে আষাঢ়ে গল্প কার না ভালো লাগে যদি তা একজন ভালো গল্পকারের মুখে শুনা যায়।

আমি আর রুহান গল্প করতে কখন যে মশকরা চাচার ভ্যানের সামনে এসে পড়েছি, এসে দেখলাম মশকরা চাচা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, তিনি বললেন,” বৃষ্টির সময় কেউ ঘরে থেকে বের হয়ে না। তোমরা কি চা খেতে এসেছো নাকি?”

রুহান বললো” জ্বি , চাচা। চা খাবো আর আপনার কাছ থেকে আজকে  একটা গল্প শুনবো গতবারের মতন।“

আমি বললাম,” হ্যা, কালো মেঘের ভেলা যখন আকাশে উড়ে তখন মনগড়া আষাঢ়ে গোল্প শুনতে ভালোই লাগে।“
মশকরা চাচা চেতে গেলো। বললো,” আমার গল্প কি মনগড়া নাকি? কে বলেছে তোমায়? যে আমার কাহিনীকে মনগড়া ব্অলে সে সত্যের মর্ম কি বুঝে? তার নিজের সাথে যতোদিন আ ঘটবে ততোদিন আর ববুঝবে না।“

আমি মনে মনে বললাম, “ এই যাহ, মশকরা চাচা দেখি ক্ষেপে গেছে। “
দেখলাম রুহান আমাদের দিকে আড় চোখে তাকালো। নিশ্চিত কয়েক ডজন গালি খেলাম রুহানের কাছ থেকে।

রুহান বললো,” আরে চাচা চটছেন কেনো? সবার কথা কান দিলে কি হয়? ও তো ভীয় পায়। এশোব বোলে আরকি নিজেকে স্বান্তনা দিচ্ছিলো। আপনি চা বানান চাচা। আমরা এখানে বসছি।“

আমরা ভ্যানের সামনে বেঞ্চে বসলাম। চাচা চা বানানো শুরু করলো। চাচাকে দেখলাম রাগ কমিয়ে খুশিতে চা বানাচ্ছে। চাচা গল্প বলার মানুষ পেলে খুশিই হয় বটে। তার উপর আমরা বয়সেও তার থেকে অনেক কম। চাচা দেখলাম তিনকাপ চা বানালো। দুই কাপ আমরা নিলাম। আরেক কাপ চাচা নিজে খাবে । চাচার ভ্যানে সিগারেটও আছে,বিক্রি করেন, তাকে কখনো খেতে দেখিনি। আমরাও খাইনা। ভালোই হয়েছে আমরা খেলে তার সামনে সিগারেট ধরাতে পারতাম না । বয়স্ক মানুষ। আর তিনি খেলে আমাদের অসুবিধা হতো, সিগারেটের ধোঁয়া মোটেও সহ্য হয় না।

চাচা চায়ে লম্বা একটা চুমুক দিলো। তারপর একটা গলা খাকানি। বুঝলাম গল্প আসছে ভেতর থেকে।

 

“এই অনেকবছর আগের কথা। কিছু টাকা কড়ি জমানো পর ভাবলাম গ্রামে গিয়ে ঘুরে আসি। পরিবার আত্মীয় স্বজণদের সাথে দেখা কর আসি। যেমন ভাবলাম সব কিছু গুছগাছ করে তেমন রউনা দিলাম। কয়েক ঘন্টা যাতায়াত করে গ্রামে ফিরলাম । আগের মতন কিছু নেই বুঝলে। আগের মতন গ্রাম আর নেই। গ্রামের সবাই অভাব দূর করতে জায়গা জমি বিক্রি করে সৌদি যায় কাজের জন্যে। কয়েকবছর সেখানে কামলা খাটে । টাকা পয়সা করে। নতুন জায়গা জমি করে। ভিটেতে ইটের ঘরে-বাড়ি তুলে। কিছু টাকা ব্যাংকে জমায় । পরে দেশে এসে বিয়ে করে ব্যাংকের টাকা ধীরে ধীরে খায়। টুক টাক কাজ কর্ম করে। কারণ কথায় আছে না বসে খেলে রাজার সম্পদও ফুরায়। তো এরকম অনেক লোক দেশের বাহিরে গিয়ে ঘর-বাড়ি তুলে দেশেও ফিরে এসেছে। কয়েকজন এখনো আসেনি। আগেড় মতন টিনের বাড়ি আর নেই। তাও ভালো দেশের উন্নতি হচ্ছে।  আমার বাপ-দাদার অবস্থা নেহাত মন্দ ছিলো না বলে আমাদের ঘড়বাড়ির অবস্থা ভালোই ছিলো। বাড়িতে ফিরার পর বউ মেয়ে কাতিরদারি করছে, পাড়ার অনেকেই এসেছিলো দেখা করতে। লম্বা যাত্রা করে এসেছি বলে দুপুরে লম্বা একটা ঘুম দিলাম। বিকেলে মেয়েকে নিয়ে ঘুরলাম। বাজারে গেলাম। চা এর টং এ বসলাম । অনেক পরিচিতদের সাথে দেখা হলো। এভাবেই সারাদিন কেটে গেলো। রাতে আট টার=ইয় খেয়ে শুয়ে পড়লাম। টিনের ঘরের বদলে ইটের ঘর হলে কি হবে, গ্রামের লোক এখনো আগে আগে ঘুমায়। রাত আট টা মানে অনেক রাত। জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম। হাতেগুনা কয়েকটা বাড়ি তে আলো। সেসব বাড়ির লোকদের আমি চিনি। ওদের ঘরে আমার মেয়ের মতন কয়েকজন আছে, যারা পড়াশুনা করছে। আর কয়েকটা ঘরের টিভি আছহে হয়তো, আওয়াজ পাচ্ছিলাম।  সে যাই হোক দুপুরে ঘুমানোর ফলে আমি আমার দু-চোখের পাতা এক করতে পারছিলাম না। এপাশ ওপাশ করতে রাত আরোও গভীর হলো। বিছানা ছেড়ে উঠলাম। কলস থেকে পানি খেলাম। জানালা দিয়ে আবার উঁকি দিলাম। যেসব  ঘরে বাতি ছিলো এখন তাও নেই। পুরো অন্ধকার । শহরের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট আছে, গ্রামের রাস্তায় নেই। আমি আবার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। এপাশ ওপাশ করছিলাম। অনেকক্ষণ পর চোখ জোড়া প্রায় লেগে আসছিলো। হুট করে চেচানোর শব্দ । ধীরে ধীরে বাড়ছে। ধীরে ধীরে যেনো মানুষের চেঁচানোর কণ্ঠস্বর যেনো বাড়ছে। আমার ঘুম সড়ে গেলো চোখ ঠেকে। আমার মেয়ে ও আমার বউ বিছানায় উঠে বসেছে। তাদের চোখে ভয়। সবাই চেঁচাচ্ছে কেন? আমি আমার মেয়ে ও বউ কে ঘরে থাকতে বলে বাহিরে যেতে চাচ্ছিলাম  কি হয়েছে দেখতে। বউ বললো আমরা একা ঘরে থাকবো না। ভয় করে। আমার বউ এমনে সাহসী । সারাবছরই তো আমি গ্রামের বাইরে থাকি। তখন তো  সে একাই থাকে। সত্য বলতে আমাকে একা বাহিরে যেতে দিতে চাচ্ছে না। আমি বললাম চলো তাহলে। মেয়ের মা মেয়ে কে কোলে নিলো। আমি টর্চ ধরে সামনে যাচ্ছিলাম। সামনের ক্ষেত থেকে বিশাল চেঁচামেচির শব্দ আসছে। শব্দের উৎস ধরে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখলাম গ্রামের  ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে এক লোক  কাঁদামাটি ভেঙ্গে দৌড়াচ্ছে। সবাই তাকে ধাওয়া করছে। চোর হয়তো। অনেক মহিলাও জমা হয়েছে। আমার বউ খোজ নিয়ে এলো তাদের কাছ থেকে।

 এসে বললো, ”ও তো আমাদের পাড়ার নুরহান। কয়েকদিন হলো বিদেশ থেকে ফিরেছে।“

“ ফকরার দা’র ছেলে নুরহান?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

“হ্যা, গো হ্যা।“

“বিদেশ থেকে এসে চুরি করতে গেলো কেনো?”

“ চুরি না গো, ওর নিশির ডাক পড়েছে। বলেছিলাম না তোমায় সেদিন।“

পরে আমার মনে পড়লো। চা স্টলে এ নিয়ে আলাপ হয়েছিলো বটে। আমি কানে তুলিনি প্রথমটায়। উড়িয়ে দিয়েছিলাম। এখন দেখে বিশ্বাস হচ্ছে।

পরে কয়েকজন এসে আমায় ধরলো। এসে বললো,”কি মশকরা মিয়া? আমোড়া টো ছেড়াডারে দৌড়াইয়া ধরবার পারতাছি না। তুমি একটু দেহ না ভাই। আমরা সেই কখন থেইকা চেষ্টা করতাছি। এমনে ওয় দৌড়াইতে থাকলে বেশীক্ষণ বাঁচবো না। আর তাছাড়া সামনে খাল।“

মনে পড়লো আজকে চা স্টলে যখন নিশির ডাকের কথা বিশ্বাস করতেছিলাম ন তখন শুক্কর আলি তার ছেলের কথা কইলো। ওয় নাকি নিশির ডাকে দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া খালে লাফ দিয়া মারা গেছে।

আমি পরে দৌড়িয়ে ওকে ধরার চেষ্টা করলাম। অনেক্ষণ চেষ্টা করার পর পারলাম ওকে ধরতে। সবাই আমাকে অনেক ভালো বললো। সে যাই হোক। একজনের প্রাণ বাঁচাতে পেড়েছি এই অনেক। কিন্তু এভাবে আর কয়দিন

এর আগেও নাকি পাশের গ্রাম থেকেও কয়েকজন যুবক নিশির ডাকে এই খালে এসে লাফ দিয়ে মারা পড়েছে। খোজ নিয়ে দেখলাম যারা এভাবে মারা পড়েছে প্রায় সবাই বিদেশ ফেরত।মারা যাওয়ার সংখ্যা খুব বেশি না হলেও কমও নয়। এদের মধ্যে কয়েকজন নাকি এসে বিয়েও করেছিলো।  গ্রামের সকলের মধ্যে ভয় ঢুকে গিয়েছে। যারা বিদেশ থেকে নিজের গ্রামে আসতে চাচ্ছে তাদেরকে তারা মা বাবা আস্তে নিষেধ কোড়ছে। আর যারা যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, জায়গা জমি বিক্রি করে, টাকা পয়সা খরচ করে পাসপোর্ট করেছে তাদের যাওয়া আটকে পড়েছে।

সকালে উঠে বউ এর কাছে বিস্তারিত জানতে চাইলাম। মহিলাদের কাছে এসব ভালো তথ্য পাওয়া যায়। বউ এর কাছে শুনে যা বুঝলাম সবার প্রথমে অই খালে যে  মারা গেছে নিশির ডাকে মারা যায় নি, সে আত্মহত্যা করেছে। সেও বিদেশ ফেরত এক যুবক ছিলো। এই গ্রামেরই এক ছেলে। বাব মা নেই। বিয়ে করে বউ কে রেখে বিদেশ গিয়েছিলো । চার বছর বিদেশে কামলা খেটে বাড়ি ফিরে দেখে বউ নেই। সব টাকা নিয়ে আরেক ব্যাটার সাথে পালিয়েছে। এই শোকে করেছে আত্মহত্যা।এ

পরে যা বুঝলাম এসব কাজ তারই । সেই বিদেশ ফেরতদের এভাবে খুন করছে,

সকালের নাস্তা করে গেলাম নুরহানদের বাড়ি । বাড়ি যেতেই সবাই আমাকে খাতির করতে লাগলো। প্রসংসা করতে লাগলো। আমি তখুন নুরহানের সাথে দেখা করতে চাইলাম। বাড়ির লোকেরা বললো নুরহানের নাকি খুব জ্বর। তাই আর দেখা করলাম না। তাদেরই জিজ্ঞেস করলাম ওর সাথে কথা হয়েছিলো কিনা। নুরহান কিছু বলেছিলো কিনা।

বাড়ির লোকেরা জানালো তা অনেকটা এরকম যে নুরহান বিদেশে থাকাকালীন তার সাথে একজন থাকতো। ওর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুও হয়েছিলো।  নাম তার জামাল। তো সেদিন রাতে জামালই নাই ডাকছিলো । নুরহান নাকি ওর পিছন পিছনই দৌড়াচ্ছিলো।

তারপর আরোও কিছু জিগেস করলাম । নুরহানকে ঠিকঠাক খেয়াল রাখতে বলে আম বাড়ি ফিরে আসলাম।

তারপর অনেকদিন কেটে গেলো। আমি আবার শহরে চলে আসবো। বসে বসে খাবো আর কয়দিন । শহরে এই চা এর দোকাণেড় পাশাপাশী একটা কোম্পানি তেও চাকরি করি। তাই চলে আসতে হবে।চলে আসার কিছুদিন আগেই ঘটলো আরেকটি ঘটনা। সকালে ঘুম থেকে উঠে খাওয়া দাওয়ার পর উঠোনে টুল পেতে বসে ছিলাম। তখন আবার শোরগোল শুরু হলো কিসের যেনো। গিয়ে খোজ নিলাম।

জানলাম খালের দিকে দুটো লাশ পাওয়া গেছে। লাশ দেখার কোনো ইচ্ছাই হচ্ছিলো না। বাড়িতে ফিরে বসে রইলাম। বউকে বলতেই সে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলো। মহিলা মানুষ এমনই হয়। মেয়েকে আমার কাছে দিয়ে সে গেলো দেখতে।

অনেক্ষণপর সে বাড়ি ফিরে আসলো। এসে জানালো অই যে আত্মহত্যা করেছিলো বউ আরেক ব্যাটার সাথে পালিয়েছিলো বলে তার অই বউ আর সেই ব্যাটার লাশ পাওয়া গেছে।

আমি শুনে চমকে উঠলাম। তবে একটা নিশ্চিন্তের ভাবও এলো মনের মধ্যে কারণ যদি সত্যিই লাশ দুটো ওদের হয় তাহলে আশা করাই যায় এ গ্রামে আর কখনো নিশি কাউকে ডাকবে না।“

এই বলে মশকরা চাচা চুপ করলেন । বুঝলাম গল্প শেষ।

আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম,”ওরা দুজন ফিরে এসেছিলো কেনো?”

মশকরা চাচা বললেন,”জানি না ,হয়তো তারা জানতে পেরেছিলো তার আগের জামাই মারা গিয়েছে। গ্রামের লোকেরাও এতোদিনে  তেমন কিছু মাথায় রাখবে না। এখন গ্রামে ফিরে গিয়ে আরামেই থাকা যাবে। তখনও যদি জানতে পারতো নিশি অপেক্ষা করছিলো ওদের জন্যে তাহলে তারা ভুল করেও এ পথের মুখ দেখতো না। নিজের মৃত্যু সবাই চায় না যদি জীবনে খুব বড় কিছুর হারানোর ব্যাথা না থাকে। ঐ মেয়ের আগের স্বামী  ওণেকবোছোড় কামোলা খেতে,পরিশ্রমের টাকা বিশ্বস্ত কাউকে পাঠিয়ে যখন দেখলো সে ধোঁকা দিয়েছে তখন মৃত্যুই হয়তো টাড় কাছে সহজ মনেহয়েছে।“

আমি বললাম,” কিন্তু সেটা বোকামি ছিলো,আত্মহত্যা কখনো কিছু সহজ করে না।“

রুহাণ  এটক্ষণে কথা বললো,” আসলেই। তবে নিশি তার কাজ করে কীভাবে, এটা মূলত কেমন ভুত?”

হায়রে রুহান। এটাও  জানে না। মশকরা চাচা বললো,

ভূতদের মধ্যে অন্যতম ভয়ংকর হলো নিশি। অন্যান্য ভূত সাধারণত নির্জন এলাকায় মানুষকে একা পেলে আক্রমণ করে। কিন্তু নিশি গভীর রাতে শিকারকে তার প্রিয় মানুষের কন্ঠে নাম ধরে ডাকে এবং বাইরে বের করে নিয়ে যায়। নিশির ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষ সম্মোহিত হয়ে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে; আর কখনো ফিরে আসে না। মনে করা হয় তারা নিজেরাও নিশিতে পরিণত হয়। কিছু কিছু তান্ত্রিক অন্যের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নিশি পুষে থাকে। নিশিরা কোন মানুষকে তিনবারের বেশি ডাকতে পারে না। তাই যে কারো উচিত রাতে তিনবারের বেশী ডাকলেই ঘর থেকে বের হওয়া। এতে করে নাকি নিশির আক্রমণের ভয় থাকে না।“

রুহান বুঝেছে এমন ভাব করলো। আমরা উঠে গেলাম। আরেকটু পর সন্ধ্যা হবে। চা এর বিল চলে যাচ্ছিলাম। মশকরা চাচা বললো, “ এঈ ছাতা নিবে না?”

তখন মনে পড়লো ছাতার কথা। সারাদিন যে বৃষ্টি হোয়েছীল সেটাও ভুলে গিয়েছিলাম। চাচাকে ধন্যবাদ দিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ালাম। কৃষি গেইট দিয়ে ঢুকে রুহান বললো,

”তুই তো আজকে গল্প শুনতে বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছিলি।“

 আমি বললাম,”মুখ ফসকে বের হয়ে গিয়েছিলো রে। তাই তো পরে গল্পের মাঝখানে কোনো কথাই বলিনি ,দেখলি না। 

তারপর  আজকেও যে চাচা ভালোই চাপা ছেড়েছে তা নিয়ে আলাপ করতে করতে বাড়ি ফিরলাম  দুজনে।


Post a Comment

Previous Post Next Post