ভর্তিযুদ্ধে সবথেকে খারাপ একটি যুদ্ধ। এইচএসসির পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় হেরে গিয়ে যখন আমি ক্লান্ত তখন বাসা থেকে জোড় করেই ভর্তি করে দিলো উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে। আমার কিছু করার ছিলো না। আমি কয়েকদিন বিশ্রামের জন্যে সময় চেয়েছিলাম,কিন্তু পাইনি। পেয়েছি শুধু বাবা-মা'র কটু কথা আর ধমক। তখন কিছু বলারও থাকে না। কি বলবো? বলার কোনো মুখ থাকে?
আমি যে যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলাম তা কোনোভাবেই তাদের চোখে ধরা পড়লো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকার মধ্যে যে একটা কপালের ব্যাপার থাকে সেদিক দিয়েও আমি পিছিয়ে। আমার চেয়ে কতো খারাপ স্টুডেন্ট এর পাশে ভালো স্টুডেন্ট বসায় তাদের উত্তরপত্র দেখে সে-ই খারাপ স্টুডেন্টও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে যায়।নিজ চোখে দেখা এরকম হতে। এ নিয়ে আর কি বলবো। আমার মতন হতোভাগা অনেক আছে। আমার এক বন্ধু আমার চেয়েও অনেক ব্রিলিয়ান্ট। তার কোনো জায়গায় হয়নি। থাক দুঃকখের কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।
উত্তরা ইউনিভার্সিটির মেইন ক্যাম্পাস এখনো নির্মাণাধীন। কাজ চলছে। ক্লাসরুমগুলো যদিও মোটামুটি শেষ কাজ। ক্লাস করা যায়। কয়েকদিন পর এসি,মাল্টিমিডিয়া অন হবে। তো আমি এডমিট হওয়ার পর একটা ক্লাস করে একটু ফ্রী টাইম পেয়েছিলাম। গেলাম লাইব্রেরিতে। লাইব্রেরি অনেক সুন্দর। অনেক বই সাজানো হয়েছে। এখনো অনেক বই বাক্স বন্দি।ববের করে হয়নি অনেক ভাইয়া আপু ভেতরে। কেউ বসে এসাইনমেন্ট করছে। কেউ বসে গল্পের বই পড়ছে।
আমি হাটতে হাটতে সব দেখছি। দু পাশে বই। গল্পের বইও অনেক।পরিচিত লেখক এর না দেখলে সেই বইটা নামিয়ে,পেইজ উল্টিয়ে আবার জায়গা মতন রেখে দিচ্ছি।গল্পের বই হাতাতে অনেক ভাল্লাগে।পড়তে গেলে এক পেইজ বা দুই পেইজ এর পড় আর ধৈর্য খুজে পাই না।
তারপর লাইব্রেরি থেকে বের হওয়ার সময় দেখলাম একটা ভাইয়া সেল্ফ থেকে বই বের করলো একটা। কি বই সেটা খেয়াল করিনি। যা খেয়াল করলাম সে যেনো কার সাথে কথা বলছে। একা একা। তার আশেপাশে তো কেউ নেই। কার সাথে কথা বলছে সে? অবাক হলাম। তারপর সে বইটা হাতে নিয়ে বের হয়ে গেলো কথা বলতে বলতে। একা একাই।
আমার মনোযোগ তখন অন্যদিকে চলে গিয়েছিলো। একটা বই আমার মনোযোগ কেড়ে নিলো। দ্যা হার্ডি বয় সিরিজের দ্যা গ্রেইট এয়ারপোর্ট মিস্ট্রি। বইটা পুরানো। দেখে অনেকটা অ্যান্টিক অ্যান্টিক ভাব আসে। যদিও অ্যান্টিক সম্বন্ধে ধারণা নেই।মনেহলো আর কি।ভাবলাম বইটা বাসায় নিয়ে গিয়ে পড়ার চেষ্টা করবো। কিন্তু এখনো আমার লাইব্রেরি কার্ড নেই। সেটার প্রসেস জানতে গেলাম।
তারপর আবার ক্লাস। বোরিং লাগে। মন টানে না ক্লাসে। টানা দুটো ক্লাসের পর নামাজের জন্যে আর টিফিনের জন্যে ব্রেক পেলাম। আধা ঘন্টার জন্যে,একটা থেকে একটা ত্রিশ।
উত্তরা ইউনিভার্সিটির নীচতলায় বড়সড় সুন্দর একটা ক্যাফেটেরিয়া করেছে। আমি একটা কফি নিয়ে বসলাম। সকালের ক্লাসের পর যে ব্রেক পেয়েছিলাম তখন লাইব্রেরি কার্ডের জন্যে সবকিছু জমা দিয়ে এসেছিলাম। বলেছিলো লাঞ্চের ব্রেকে এসে কার্ড নিয়ে যেতে,বই নিতে পারবেন তখনও।
আমি তখন কার্ড আর দ্যা গ্রেইট এয়ারপোর্ট মিস্ট্রি বইটা নিয়ে এসেছিলাম। এখন বইটা খুলে পেইজ উল্টাচ্ছি আর কফি গিলছি।
হঠাৎ করে সামনের টেবিলে নজর গেলো আমার। দেখলাম সেই ভাইটা। আমার মতোই কফি খাচ্ছে আর একটা বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে। আমার সাথে মতো না যেটা সেটা হচ্ছে মাঝেমাঝেই কার সাথে যেনো কথা বলছে। প্রথমে ভেবেছিলাম সে পাগল কিনা।কিন্তু পাগল তো নয়। পাগল হিতে যাবে কেনো?
'কফি ঠান্ডা হয়ে যাবে তো," হঠাৎ করে বলে উঠলো একজন। আমি চমকে তাকালাম তার দিকে। একটা মেয়ে। চিনি না । সেও কফি নিয়ে আমার সামনে বসেছে।
আমি বললাম,"হ্যাঁ, খাচ্ছি। কে আপনি?”
“আমাকে চিনে কি হবে?”
আমি আর কথা বাড়ালাম
নাহ। সে জিজ্ঞেস করলো,”ঐ ছেলে দিকে এভাবে তাকিয়ে ছিলে কেনো?”
“কই না তো!”
“আমি দেখেছি”
“এমনেই”
“এমনেই কেনো? এমনেই কি
কেউ কারোর দিকে তাকিয়ে থাকে? তুমি ছেলে হয়ে আরেক ছেলের দিকে এমনেই তাকিয়ে ছিলে
কেনো? “
এবার আমাকে একটু ইতস্তত
হয়েই বলতে হলো,” না মানে উনি বারবার নিজের সাথেই কথা বলছে , তাই আর কি!”
“না তো, সে তো নিজের
সাথে কথা বলছে না।“
“মানে?”
“ সে কথা বলছে তার
কল্পনার সাথে , আমার সাথে।“
“ আপনি কি বলছেন ? আমি
আপনার কথা কিছুই বুঝছি না।“
“অনেকদিন আগের কথা। ও
যখন সেকেন্ড ইয়ার এ। ওর একটা রিলেশন ছিলো একজনের সাথে। ওকে ও খুব ভালোবাসতো। ওর
বাসায় ওই মেয়েকে নিয়ে আলাপও হয়েছিলো। মেয়েটা নিজের বাসায় বলতে ভয় পেতো। সেকেন্ড
ইয়ারেই সে তার নিজের বাসায় বলতে চাইতো না। সে বলতে চাইতো একদম পড়ালেখা শেষে ,এতে
অবশ্য ওই ছেলের কোনো আপত্তি ছিলো না। একদিন ও ঐ মেয়েকে নিজের বাসায় নিয়ে গেয়ে
নিজের বাবা মার সাথে আলাপ করাতে চেয়েছিলো। সে-ই কথামতন অড় বাবা মা আর ও বাসায়
অপেক্ষা করছিলো । কিন্তু অই মেয়েটা আসলো না। তারপরের দিন ও ভার্সিটি এসে মেয়েটির
খোজ নিলো। মেয়েটি যেনো কোথায় হারিয়ে গেলো। ভার্সিটি তেও আসলো না।“
“কি বলছেন এসব?”
“সত্যি বলছি। এর পর
থেকেই ও ওরকম হয়ে গেছে। ও এমনিতে পুরোপুরি সুস্থ। কিন্তু ও ঐ মেয়েটিকে ভুলতে
পারিনি। সব সময় নিজের কল্পনায় ও অই মেয়ের সাথে কথা বলে। “
“আপনি এসব কি করে
জানলেন? কে আপনি? আপনি তখন কেনো বললেন যে ও আপনার সাথে কথা বলছিল?”
“কারণ আমিই অই মেয়েটি।“
এটা বলে মেয়েটি এক
পৈশাচিক হাসি দিলো। আমি তার কথা শুনে চমকে তো গেছিই আর তার হাসি শুনেও। আশেপাশে
কেউ এদিকে তাকাচ্ছে কিনা সেটা দেখার জন্যে আমি আশে পাশে তাকালাম। কিন্ত কই। কেউ
তাকাচ্ছে না। পরে আমি সামনে তাকালাম। দেখি অই মেয়েটি নেই। কোথায় গেলো। আমি দাঁড়িয়ে
গেলাম। তাকে খুজতে লাগলাম। মূহুর্তের মধ্যেই কোথায় উধাও হয়ে গেলো সে! ভয় পেয়ে
গেলাম সত্যি বলতে। এক নিমিষেই কেউ উধাও হতে পারে এভাবে।
তারপর আমি উঠে চলে
গেলাম। যেতে যেতে সেই ভাইটির দিকে আবার ফিরে দেখলাম। আগের মতই মাঝে মাঝে নিজের
সাথে কথা বলছে। তারপর আরেকটা ক্লাস হলো। ক্লাস শেষে সেই হকচকানি ভাবটি চলে গেলো।
আজ আর ক্লাস হবে না। এখন ভার্সিটির বাস দিয়ে চলে যাবো।
নীচে নামতে নামতে দেখলাম অই ভাইটা লাইব্রেরীর সামনে
অভিযোগ বক্সের সাথে বসে থাকা মামার সাথে কথা বলছে। কথা বলে চলে গেলো।
আমি পরে নামছি আর ভাবছি
অই মামার সাথে খাতির করতে হবে । খাতির করে অই ভাইয়ার সম্পর্কে জানা যাবে। আর ভাবতে
লাগলাম ঐ মেয়েটার কথা। মেয়েটা হুট করে হাওয়া হলো কীভাবে? মেয়েটার কথা সত্যি হলে ওই
মেয়েটা ওই ভাইয়ার সাথে এরকমটা করলো কীভাবে? আমার রাগ হচ্ছিলো। কিন্তু অই মেয়েটা তো
বললো যে ভাইয়া আর উনাকে খুজেই পায়নি। ভার্সিটিতে খুজেই পায়নি। কি আবোল তাবোল বকে
গেলো মেয়েটি। নিশ্চয়ই আমাকে বোকা বানিয়ে গেছে। অই মেয়েটার উপর আমার রাগ হচ্ছে।
সামনে পেলে না একটা কথাও ছেড়ে বলবো না। হোকগে সিনিয়র।
সেদিন বাসায় চলে গেলাম।
কোনো কিছুতেই আর মন বসলো না।
পরেরদিন থেকে মামার
সাথে খাতির করা শুরু করলাম। তারপর শুক্রবার আসলো।
শুক্রবার , শনিবার আর
রবিবার এই তিন দিন অফ দে। আর বাকী চারদিন ক্লাস হয়। এমনিতে এই তিনদিনের জন্যে বসে
থাকি। আরামে কাটে বলে এই তিনদিন খুব তাড়াতাড়ী কেতে যায়। কিন্তু আজ সময় যাচ্ছে না।
তারপর সোমবার গেলাম
ভার্সিটি। মামাকে আজকে জিজ্ঞেস করেই ছাড়লাম,”মামা অই ভাইকে চিনেন ? কে উনি?”
মামা কতক্ষণ আমার দিকে
তাকিয়ে ছিলো।
পরে বললো, “ বুঝেছি।
ওকে নিজের সাথে কথা বলতে দেখে জিজ্ঞেস করেছো তাইনা? আমি দেখেছি নতুন কেউ ভর্তি হলে
প্রায় সবাই ওর এই আচরণটার কারণে ওর দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকে। তবে সবাই এটাকে তেমন
গুরত্ব দেয় না, তুমি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলে বলে তোমাকে বলছি। অই ছেলেটা এখন ফাইনাল ইয়ারে। সেকেন্ড ইয়ারে
থাকতে একটা মেয়ের সাথে ওর প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। মেয়েটাকে কে একদিন বাড়ি ফেরার পথে
একদল ছেলে ওকে ধর্ষন করে খুন করে । এরপর থেকে অই ছেলেটা এমন হয়ে যায়। নিজের সাথে
বিরবির করে কথা বলে। ছেলেটা আজও বিশ্বাস করতে পারেনি বোধহয় যে মেয়েটা মারা
গিয়েছে।“
এসব শুনার পর আর ভালো
লাগছিলো না। মামাকে সালাম দিয়ে চলে আসলাম। কি পৈশাচীক কাজ হয়েছে অই আপুর সাথে।
তাহলে কি আমি যাকে দেখেছিলাম সেওই কি অই আপু! নাহ এ কি করে হয়। তারপর আমি ল্যাবে
গিয়ে গুগল করলাম ।
গুগল করে দেখার পর আমার
শরীরে যেনো হীমহয়ে গেলো। আমি সেদিন ক্যাফেটেরিয়াতে এই আপুটাকে দেখেছিলাম সেই
আপুটাই ধর্ষনের শিকাড় হয়ে মারা গিয়েছিলো। সেই আপুটাই অই ভাইয়ার প্রেমিকা ছিলো। আমি
যেনো চেয়ার ছেড়ে উঠতে পাড়ছি না। খুব কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে ক্লাসে গেলাম। ব্যাগ
নিয়ে চলে আসলাম। আজকে আর ক্লাস করবো না। ন=বাসায় চলে যাবো। বাসে উঠলাম। সিটে বসে
বসে ভাবছি মানুষ বড়ই বিচিত্র,পুরুষ জাতিও বড়ই বিচিত্র। একদল পশুর ন্যায় পুরুষ একটা
মেয়েকে ধর্ষন করলো। আর এক পুরুষ সেই মেয়েটিকে আজও ভালোবাসে। পশুও তো অনেক ভালো
অইদল লোক থেকে। কিত্নু অই আপুটা আমাকে দেখা দিলো কেনো। আমাকেই এতো কিছু বলে গেলো
কেনো। এসব ভাবতে ভাবতে আমি বাসেই ঘুমিয়ে গিয়েছি।
তারপর দেখলাম অই আপুটা
আবার সামনে এসেছে। আমাকে বলছে,” তুমি ভাবছো না আমি তোমাকে দেখা দিয়েছি কেনো? জানতে
চাও কেন? কারণ আমাকে সেদিন রাতে যারা ধর্ষন করেছিলো তাদের মধ্যে তোমার ভাইও ছিলো।
তোমার ভাইকে আমি তো মেরে ফেলেছি। একে একে তার পরিবারের সবাইকে মারবো। তারপর সে
আবার পৈশাচিক হাসি হাসলো।“
আমার ঘুম ভেঙে গেলো।
দেখলাম আমি ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়া তে বসে আছি। আমি ঘামছি। আমি অবাক। আমার শরীরের
ভেতর দিএ ঠাণ্ডা রক্তের স্রোত বএ যাচ্ছে। তবুও অনেক ঘামছি। আমি ক্যাফেটেরিয়াতে
কীভাবে এলাম। আমি তো বাসে ছিলাম। আর আর আমার ভাই। সে গতবছর মারা গিয়েছিলো বাস
এক্সিডেন্টে। আমি ঘামতে ঘামতে ভিজে গেলাম। কতোক্ষণ পরে দেখলাম একজন কফি নিয়ে আমার
সামনে এসে বসলো,ক্যাপ পরা,মাথা নীচের দিকে। তাই চেহারা দেখা যাচ্ছে না। মাথা উচু
করে বললো কফির টাকা টা দেন। আমি দেখলাম সে আর কেউ না সে আমার ভাই। আমার আপন ভাই।
যে গতোবোছোড় বাশ এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে। আমি ভয়ে চেয়ার থেকে পরে গেলাম। ভাই আমার
দিকে উপর হয়ে এসে বলছে টাকা দেন। টাকাটা দেন।
তারপর আমার গায়ে ধাক্কা
অনুভব করলাম। আমার ঘুম ভাঙল। দেখলাম বাসের
হেল্পার বলছে , ”ভাই,টাকাটা দেন।“ আমি তখনও ঘামছি ভয়ে।
